সেবা খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতি ১২৬৩৩ কোটি

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ০৩:৩১ এএম

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ২০২৫ সালেও দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৩ সালে যে পরিস্থিতি ছিল, তার তুলনায় ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেবা খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা আরও বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) খানা জরিপে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে এক বছরে বিভিন্ন সেবা খাতে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ১ দশমিক ৫৮ শতাংশের সমান। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডি মাইডাস সেন্টারে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ তথ্যচিত্র তুলে ধরা হয়।

টিআইবি জানায়, ২০২৫ সালে দেশের সেবাগ্রহীতাদের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন, যা ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। এটি যেমন একটি বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি, তেমনই দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বেশি। দুর্নীতি প্রতিকার, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ১০ দফা সুপারিশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনা কাঠামো ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চল থেকে দুই ধাপে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা নির্বাচন করে এই জরিপ করা হয়। জরিপে সুনির্দিষ্ট ১৮টি সেবা খাতের চিত্র উঠে এসেছে। এর আগে ২০২৩ সালে এই জরিপ করেছিল টিআইবি।

জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার মনে করে, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিচারিক সেবায় ঘুষ ও দুর্নীতির উচ্চহার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা হয়ে আছে। পাশাপাশি কৃষি, স্থানীয় সরকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট ও বিআরটিএ খাতেও দুর্নীতির প্রবণতা বেড়েছে বা আগের মতোই রয়ে গেছে। দুর্নীতির শিকার হলেও ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি। তাদের মতে, পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত। আবার প্রায় অর্ধেক পরিবারেরই দুর্নীতির অভিযোগ কোথায় ও কীভাবে করতে হয়, সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই।

জরিপের ফল বলছে, ২০২৩ সালের মতো ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট (৭৬.৬ শতাংশ) ও বিআরটিএ (৬৩.৫) থেকে সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এরপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা। এ সব খাতে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণও সবচেয়ে বেশি। তবে সার্বিকভাবে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। গত বছরে খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ৫ হাজার ১২৪ টাকা।

টিআইবির খানা জরিপ ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, কর্তৃত্ববাদী সরকার পতনের পর বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন ছাত্র-জনতা দেখেছিলেন, তার সঙ্গে বাস্তবতার বেশ অমিল পরিলক্ষিত হচ্ছে। এতে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতির হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য বলছে, দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়ার হার যথাক্রমে ১৫.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৫.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সেবা খাতগুলোর মধ্যে পাসপোর্ট অফিস এবং বিআরটিএ দুর্নীতি ও ঘুষের দিক দিয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে।

টিআইবি বলছে, বিচারিক সেবা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির উচ্চহার সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। একইসঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ভূমি খাতের মতো জনসেবামূলক খাতগুলোতেও ঘুষের দৌরাত্ম্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। জরুরিভিত্তিতে প্রশাসনিক সংস্কার এবং দুদকের কার্যকর ও স্বাধীন কর্মপদ্ধতি নিশ্চিত না করলে এই দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে কাক্সিক্ষত সফলতা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

জরিপের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ আর্থিক চিত্র। জাতীয় পর্যায়ে বর্তমানে মোট ঘুষের পরিমাণ প্রাক্কলিত ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এই পরিমাণ অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের প্রায় ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। যদিও খানাপ্রতি গড়ে ঘুষের পরিমাণ কিছুটা কমলেও মোট দুর্নীতির অঙ্ক বৃদ্ধির বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

জরিপে আরও দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলো শহরের তুলনায় বেশি ঘুষের শিকার হয় (৬৬ শতাংশ বনাম ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ)। তবে ঘুষের পরিমাণের দিক থেকে শহরের পরিবারগুলোকে বেশি টাকা দিতে হয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের তুলনায় বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়। নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও তা দুর্নীতি কমাতে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের এখনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, ফলে ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।

পাসপোর্টে দুর্নীতি উদ্বেগজনক : টিআইবির সাম্প্রতিক জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এরমধ্যে পাসপোর্ট, বিআরটিএ, বিচার-সংশ্লিষ্ট সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ভূমি-এই পাঁচ সংস্থাকে দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দেশের ১৮টি প্রধান সেবা খাতের ওপর ভিত্তি করে এই জরিপটি পরিচালনা করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেবাগ্রহীতাদের সবচেয়ে বেশি ঘুষের মুখোমুখি হতে হয়েছে পাসপোর্ট খাতে। এ খাতে ঘুষের শিকার হওয়া পরিবারের (খানা) হার জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭৬.৫ শতাংশ। ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে এই হার আরও বেশি, প্রায় ৭৯.১ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭১.৮ শতাংশ। পাসপোর্ট অফিসের পর অন্যান্য প্রধান সেবা খাতগুলোর ঘুষের হার যথাক্রমে বিআরটিএ ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ, কৃষি ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভূমিসেবা ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

জরিপের ফলে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬৩.৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা খাতে ঘুষের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে পাসপোর্ট খাতের চিত্রটি সবচেয়ে ভয়াবহ।

দুদক সম্পূর্ণ স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত : টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদককে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে নতি স্বীকার করা চলবে না। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের যে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, তা বাস্তবায়নে দুদককেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে প্রতিষ্ঠানটি যদি কাজ করতে পারে, তবেই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, এমন এক সময়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করছি, যখন দুর্নীতি দমন কমিশন বাস্তবে স্থবির। কারণ গত তিন থেকে সাড়ে তিন মাস ধরে কমিশন নেই। আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, সার্চ কমিটির কার্যক্রম সম্পন্ন করে দুদকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং এমন নেতৃত্ব দেওয়া হোক, যাতে মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, দুদকের ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে, যাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান রয়েছে; যারা আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমানভাবে বিবেচনা করে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

দুদক সম্পর্কে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার জানলেও অভিযোগ করার হার খুবই কম। আর অভিযোগ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা হয়নি বা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, দুর্নীতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বিচারহীনতা, সচেতনতার অভাব এবং দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির বদলে সুবিধা পাওয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত