২৪ ফুট বাই ২০ ফুটের একটি কক্ষ। মাথার ওপরে টিনের চালা। রোদের তাপ থেকে বাঁচতে চালার সঙ্গে লেপ্টে দেওয়া হয়েছে রূপালী রঙের পুরনো পিই ফোম। কক্ষটি গুদাম ঘরের মতো। কোনো জানালা নেই। ঢোকার ও বের হওয়ার একটি মাত্র দরজা। ভেতরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে আলাদা করে তিন জায়গায় বেঞ্চ পাতা। মাঝখানে দুটি কাঠের বেঞ্চ একত্রিত করে এর চারপাশে একটি বা দুটি বেঞ্চ পেতে বানানো হয়েছে পড়ালেখার জায়গা। ঘরের এককোনায় একটা পুরনো কাঠের টেবিলে চলে দাপ্তরিক কাজ। টেবিলের পাশেই ছোট একটি শৌচাগার। সেখান থেকে আসে উৎকট দুর্গন্ধ। এটি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, কোনো অজপাড়াগাঁ কিংবা অবহেলিত কোনো জনপদে নয়, এর অবস্থান খোদ রাজধানী ঢাকার বুকে।
৬৯ বছরের পুরনো এই স্কুলের দাপ্তরিক নাম ‘মুসলিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। পুরান ঢাকার ওয়ারীর ২১৯, লালমোহন সাহা স্ট্রিটের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে দাপ্তরিক নামে এলাকার কেউ চেনেন না। গত ২২ জুন ওয়ারীর নারিন্দা বাজার পার হয়ে কয়েকজনকে স্কুলের নাম, ঠিকানা বললেও কেউ সুনির্দিষ্টভাবে ঠিকানা বলতে পারেননি। স্থানীয় কয়েকজন স্কুলটির বর্ণনা শুনে বললেন, এটি ‘এক ঘরালি’ ‘এক ঘইরা’ বা ‘এক ঘরা’ স্কুল নামে পরিচিত। তারা দেখিয়ে দেন জীর্ণ স্কুলঘরটিকে।
স্কুলে গিয়ে কথা হয় শিক্ষকদের সঙ্গে। ভেতরে গিয়ে মিলেছে ‘এক ঘরামি’ নামের যথার্থতা। গুমোট গরমে শিশু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। স্কুলটির দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে শিক্ষকরাও বিব্রতবোধ করেন। তাদের মুখেই শোনা যায় ঢাকার বুকে অবস্থিত এই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রুগ্ন করুণ দশার কথা। মো. আজাহার হোসেন এই স্কুলে এসেছিলেন ২০২০ সালে। তিনি স্কুলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তিনিসহ চারজন শিক্ষক আছেন। স্কুলে তাদের বসার আলাদা কোনো কক্ষ নেই। ব্যক্তিগত বিষয় বলেও কিছু নেই। ঘরের এক কোণে রাখা টেবিলে বসেই দাপ্তরিক কাজ করেন আজাহার হোসেন। কিছুটা অবসর পেলে শিক্ষকরা বসে থাকেন ছাত্রছাত্রীদের জন্য রাখা বেঞ্চে।
শিশুদের শিক্ষার সঙ্গে খেলাধুলা ও নির্মল বিনোদনের কথা নীতি নির্ধারকদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে খেলাধুলা বা নির্মল বিনোদন স্বপ্নের মতো। এখন অজপাড়াগাঁয়েও কয়েক তলা ভবনের দৃষ্টিনন্দন প্রাথমিক স্কুল রয়েছে। কিন্তু পুরান ঢাকার জনবহুল পরিবেশে একটি মাত্র কক্ষে কীভাবে পাঠদান চলে তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। আবার এই স্কুলের শিশুদের জন্য বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ কেউ বাসা থেকে পানি নিয়ে যায়, অন্যদের যেতে হয় আশপাশের রেস্তোরাঁ বা দোকানে। স্কুলে অফিস সহকারী, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলতে কেউ নেই। ২০২১ সালের আগে এক কক্ষের এই স্কুলে কোনো শৌচাগার ছিল না। শিক্ষকরা নিজেদের উদ্যোগে একটি শৌচাগার বানিয়ে নিয়েছেন।
আজাহার হোসেন স্কুলের কাগজপত্র ঘেটে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৯৭৩ সালে স্কুলটি সরকারিকরণ হয় এবং তখন থেকেই এভাবে চলছে। শিক্ষকরা জানান, এখানে দুই শিফটে ক্লাস নেওয়া হয়। প্রথম শিফটে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সোয়া ১০টা পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ক্লাস চলে। এরপর ১০টা ৩৫ মিনিট থেকে বেলা পৌনে ৩টা পর্যন্ত তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি ক্লাস চলে। পাঁচ শ্রেণি মিলিয়ে শিক্ষার্থী আছে মাত্র ২৫ জন। যাদের বেশিরভাগই স্বল্প আয়ের পরিবারের সন্তান। শিক্ষকরা বলেন, পরিবেশের কারণে অনেক অভিভাবক এখানে শিশুদের ভর্তি করাতে চান না। তাদের শঙ্কা, এখানে দমবন্ধ পরিবেশে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হবে না।
আজাহার হোসেন বলেন, পড়াশোনায় উৎসাহ দিতে কখনো কখনো শিক্ষকরা শিশু শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিতে ‘হোম ভিজিটে’ যান। গিয়ে দেখেন শিক্ষার্থীরা কেউ ঘুমিয়ে আছে, কেউ খেলতে গেছে, কেউ বা গেছে স্বজনদের বাড়ি বেড়াতে। স্কুলের পরিবেশের কারণে শিশুদের পড়াশোনায় অনীহা। এসব কারনে নতুন শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। প্রতিবছর আশঙ্কাজনকভাবে শিক্ষার্থী কমছে।
আজাহার হোসেন গত রবিবার জানান, সরকারি খরচে স্কুলের কিছু সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বিঘিœত হচ্ছে। তিনি বলেন, আধুনিক ও ডিজিটালের এই যুগে রাজধানী শহরে একটি মাত্র কক্ষে প্রথম থেকে পঞ্চম শেণী পর্যন্ত পাঠদান আমাদের কাছেও বিস্ময়কর। এই স্কুলকে দক্ষিণ মুহসেন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি বছরের পর বছর শুধু শুনে আসছি। কিন্তু লক্ষ্যণীয় কোনো উদ্যোগ নেই। স্কুলের এই পরিবেশের কারণে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বছর বছর কমছে। ২০২১ সালের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল ৬৭ জন। এরপর ২০২২ সালে ৫৫ জন, ২০২৩ সালে ৫০, ২০২৪ সালে ৪৭ এবং ২০২৫ সালে ৩৫ জন ছাত্রছাত্রী ছিল। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আছে মাত্র ২৫ জন।
স্কুলটি সূত্রাপুর থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অধীনে। স্কুলের বিষয়ে জানতে চাইলে সূত্রাপুর থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মির্জা নূরুন্নাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই স্কুল (মুসলিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। এটাকে দক্ষিণ মুহসেন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ছয় মাস আগে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে গেছে। আশা করছি, শিগগিরই এ বিষয়ে সমাধান হবে।’
এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সাড়া মেলেনি।