রোনালদো-মদ্রিচ কার বিশ্বকাপ শেষ হচ্ছে

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৩ এএম

বিশ্বকাপের মঞ্চে এর আগে এমন দৃশ্য দেখেনি ফুটবলবিশ্ব। আজ টরন্টো স্টেডিয়ামে ফুটবল রোমান্টিকরা সাক্ষী হতে যাচ্ছেন এক মহাকাব্যিক ও আবেগী মুহূর্তের। রাউন্ড অব ৩২-এর নকআউট ম্যাচে যখন পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া মুখোমুখি হবে, তখন মাঠের লড়াই ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠবে দুই পরম বন্ধু ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর দীর্ঘশ্বাসের গল্প।

এটি কেবল দুটি দেশের শেষ ষোলোতে ওঠার লড়াই নয়; এটি ইতিহাসের প্রথমবার ৪০ পেরনো দুই কিংবদন্তি আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও ৪০ বছর বয়সী লুকা মদ্রিচের বিশ্বকাপের আঙিনায় শেষ দ্বৈরথ। রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলা রোনালদো ও ক্রোয়েশিয়ার হৃদস্পন্দন মদ্রিচের জন্য এ ম্যাচটি এক নির্মম সত্য বয়ে এনেছে। যেকোনো একজনের জন্য এখানেই থেমে যাবে বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার। চিরতরে সাঙ্গ হবে বিশ্বকাপ জয়ের আজন্ম লালিত স্বপ্ন।

রিয়াল মাদ্রিদের সোনালি দিনগুলোতে যারা একসঙ্গে ১৩টি ট্রফি জিতে ইউরোপ শাসন করেছিলেন, আজ নিয়তির টানে তারা দাঁড়িয়ে আছেন বিপরীত মেরুতে। একদিকে রোনালদোর গোল ক্ষুধা ও পেনাল্টি বক্সের আগ্রাসন, অন্যদিকে মদ্রিচের মাঝমাঠের জাদুকরী নিয়ন্ত্রণ ও শান্ত মস্তিষ্কের খেলা। তবে মাঠের ট্যাকটিকসের চেয়েও এই ম্যাচ ঘিরে ভর করছে এক বুক ভারী করা আবেগ। যখন ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজবে, তখন টরন্টোর আকাশ মেতে উঠবে একজনের জয়ের উল্লাসে, আর অন্যজন মাথা নিচু করে বিদায় নেবেন বিশ্বমঞ্চের আলো ঝলমলে বৃত্ত থেকে।

২০১২ থেকে ২০১৮ দীর্ঘ ছয়টি মৌসুম রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলেছেন রোনালদো ও মদ্রিচ। একসঙ্গে ২২২ ম্যাচ খেলেছেন, জিতেছেন চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগসহ ১৩টি রাজকীয় ট্রফি। মদ্রিচের জাদুকরী পাস আর রোনালদোর নির্মম ফিনিশিং এই ছিল মাদ্রিদের সাফল্যের চাবিকাঠি। মদ্রিচ একাই ১৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন রোনালদোকে। একে অপরের চোখের ভাষা বুঝতেন তারা।

ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে গোল করার নজির গড়েছেন রোনালদো। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে হুংকার দিয়েছিলেন ‘আই অ্যাম ব্যাক’ (আমি ফিরে এসেছি)। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন অন্য কথা। ডিআর কঙ্গো ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে পর্তুগাল জিততে পারেনি। অভিযোগ উঠেছে, রোনালদোর ‘ইগো’ বা অহংবোধকে বাঁচাতে গিয়ে জোয়াও নেভেস বা বার্নার্দো সিলভার মতো তরুণ প্রতিভাদের বেঞ্চে বসিয়ে রাখছেন বিদায়ী কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। অথচ বড় টুর্নামেন্টে শেষ ১৪ ম্যাচে ওপেন প্লে বা নন-পেনাল্টি থেকে মাত্র দুটি গোল এসেছে রোনালদোর পা থেকে।

মদ্রিচ খেলছেন সম্পূর্ণ চাপহীনভাবে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে পেনাল্টি দিয়ে বসা ও ৬০ মিনিটের আগে মাঠ ছাড়ার পর অনেকেই তার শেষ দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু পানামার বিপক্ষে নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে (যে রেকর্ডে রোনালদোও আছেন) এবং ঘানার বিপক্ষে দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট করে মদ্রিচ প্রমাণ করেছেন তার ফুটবল মস্তিষ্ক তরুণদের চেয়ে এখনো কয়েক সেকেন্ড দ্রুত কাজ করে।

কাগজ-কলমে পর্তুগাল ফেভারিট হলেও নকআউটের বাস্তবতা আলাদা। ম্যাচের প্রথম ৬০ মিনিটই নির্ধারণ করে দেবে কার কপালে জুটবে বিদায়ের কান্না।

পর্তুগালের কৌশল : রাফায়েল লেয়াওয়ের গতি কিংবা ব্রুনো ফার্নান্দেসের রক্ষণভেদী পাস থেকে যদি পর্তুগাল দ্রুত গোল পেয়ে যায়, তবে ক্রোয়েশিয়া নিজেদের রক্ষণভাগ ছড়াতে বাধ্য হবে। আর সেই ফাঁকা জায়গায় রোনালদো হবেন মরণঘাতী।

ক্রোয়েশিয়ার কৌশল : খেলা যদি ৬০ মিনিট পর্যন্ত ০-০ ব্যবধানে ধরে রাখা যায়, তবে মানসিক চাপ পুরোপুরি চলে যাবে পর্তুগালের ওপর। ২০১৮ সালের রানার্সআপ ও ২০২২ সালের সেমিফাইনালিস্ট ক্রোয়েশিয়ার ধৈর্য তখন পরীক্ষা নেবে পর্তুগালের কাঠামোর।

যিনিই জিতবেন, শেষ ১৬-তে তার জন্য অপেক্ষা করছে স্পেন বা অস্ট্রিয়া। কিন্তু যিনি হারবেন, কানাডার মাটিতেই নেমে আসবে বিশ্বকাপের বর্ণিল ক্যারিয়ারের শেষ পর্দা। টানা দুই রাতে জার্মানি আর নেদারল্যান্ডসের মতো জায়ান্টদের বিদায় প্রমাণ করেছে নকআউটে ফেভারিট ট্যাগের কোনো মূল্য নেই। টরন্টোর মঞ্চ প্রস্তুত, এখন শুধু ট্র্যাজিক হিরো বাছাইয়ের অপেক্ষা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত