গোল করে টিকে রইলেন রোনালদো: মদ্রিচের অশ্রুসজল বিদায়

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

একজনের হাসিমুখে মঞ্চ ছাড়ার রাতে অন্যজনকে বিদায় নিতে হতো ট্র্যাজিক হিরো হয়েই। টরোন্টোর গ্যালারিভর্তি দর্শক আসলে কোনো সাধারণ ফুটবল ম্যাচ দেখতে আসেননি, তারা এসেছিলেন দুই চিরসবুজ মহাতারকার শেষ অধ্যায় পড়তে।

৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বনাম ৪০ বছর বয়সী লুকা মদ্রিচ; দুই বন্ধুর এই 'লাস্ট ড্যান্স'-এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো ফুটবল বিশ্বে। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের এই ক্ল্যাসিক দ্বৈরথে শেষ সেকেন্ডের নাটক আর ভিএআর বিতর্কের এক চরম স্নায়ুযুদ্ধে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে পর্তুগাল।

তবে ম্যাচটি কেবল পর্তুগিজদের উল্লাসের গল্প নয়, একই সাথে বিশ্বমঞ্চ থেকে এক ক্রোয়াট জাদুকরের অশ্রুসজল চিরবিদায়ের এক জীবন্ত দলিল।

ম্যাচের শুরু থেকেই পর্তুগাল বলের দখল নিয়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে। মাত্র ৪ মিনিটের মাথায় জাদুকরী গতিতে ক্রোয়াট রক্ষণভাগ ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন রাফায়েল লেয়াও। তার নিখুঁত কাট-ব্যাক থেকে শট নিয়েছিলেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ, কিন্তু প্রথম দফায় তা রুখে দেন ক্রোয়াট প্রাচীর ডোমিনিক লিভাকোভিচ এবং দ্বিতীয় প্রচেষ্টা প্রতিহত হয় রক্ষণভাগের সুতালোকে লেগে। উইংয়ের অন্য প্রান্তে চেলসি তারকা পেদ্রো নেতো ছিলেন আরও বেশি ভয়ংকর। ইভান পেরিসিচের ডিফেন্সকে নাচিয়ে একের পর এক নান্দনিক ক্রস বাড়াচ্ছিলেন তিনি। এমনই এক ক্রসে রোনালদোর হেড নিশ্চিত গোল মনে হলেও বলটি তার চুল পরিমাণ দূরত্ব দিয়ে বাইরে চলে যায়। প্রথমার্ধের আধঘণ্টা পেরোনোর পর নেতোর আরেকটি ক্রসে রোনালদো ও ফার্নান্দেজ দুজনেই স্লাইড করেও ছোঁয়া পাননি। ক্রোয়েশিয়া প্রথমার্ধে ব্যাকফুটে থাকলেও তাদের ডিফেন্সিভ মিড-ব্লক ছিল নিঁখুত, যার ফলে পর্তুগাল আধিপত্য দেখিয়েও গোলশূন্যভাবে প্রথমার্ধ শেষ করে।

বিরতির পর খোলস ছেড়ে বের হয় জ্লাতকো দালিচের ক্রোয়েশিয়া। আন্তে বুদুমিরকে তুলে মাঠে নামানো হয় দীর্ঘদেহী ইগর মাতানোভিচকে। এই এক পরিবর্তন ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। ৫৩ মিনিটে ডানপ্রান্ত থেকে জোসিপ স্তানিসিচের মাপা ক্রসে বক্সের পেছনে লুকিয়ে থাকা পেরিসিচের এক দুর্দান্ত ভলিতে পর্তুগিজ গোলরক্ষক দিওগো কস্তাকে পরাস্ত করলে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। পিছিয়ে পড়ে স্তব্ধ হয়ে যায় পর্তুগাল। এর কিছুক্ষণ পরই মাতেও কোভাচিচের পাস থেকে মাতানোভিচ বল জালে জড়ালে ক্রোয়াটরা উদযাপনে মাতে, তবে রেফারি অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল করেন। ৫৯ মিনিটে পেতার সুচিচের এক বুলেট গতির শট দিওগো কস্তা পা দিয়ে দারুণভাবে প্রতিহত না করলে ম্যাচ ওখানেই শেষ হয়ে যেত।

ভাগ্যদেবীর এই সহায়তায় এরপর জেগে ওঠে পর্তুগাল। লেয়াওয়ের ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া এক দূরপাল্লার শট ক্রোয়াটদের ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। এর ঠিক পরেই হাই বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রোনালদো গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে এক দর্শনীয় চিপে বল জালে পাঠালেও লাইন্সম্যানের অফসাইডের পতাকায় তা বাতিল হয়। তবে সিআরসেভেনকে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যায়নি। ৬৮ মিনিটে একটি কর্নার কিকের সময় ডি-বক্সের ভেতর রেনাতো ভেইগাকে কুস্তির কায়দায় টেনে ধরেন নিকোলা ভ্লাসিচ। মাঠের রেফারির চোখ এড়িয়ে গেলেও ভিএআর-এর হস্তক্ষেপে পেনাল্টির বাঁশি বাজে। পুরো টরোন্টো স্টেডিয়াম তখন নিঃশব্দ। রোনালদো স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে স্পট-কিকে লিভাকোভিচকে ভুল দিকে পাঠিয়ে বল জালে জড়ান (১-১)। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েন সিআরসেভেন, যা বিশ্বমঞ্চের নকআউটে তার ক্যারিয়ারের প্রথম গোল। পুরো গ্যালারি তখন ফেটে পড়ে তাঁর চেনা ‘সিউউউ’ উল্লাসে।

সমতায় ফেরার পর ম্যাচটি রূপ নেয় এক উন্মাদনায়। কোভাচিচের দুটি দূরপাল্লার শট এবং মাতানোভিচের একটি চতুর শট কস্তা অসাধারণ দক্ষতায় রক্ষা করেন। ম্যাচের ৮০ মিনিটে সুচিচ আবার গোল করলেও তা অফসাইডের জন্য বাতিল হয়। ম্যাচের ৮১ মিনিটে সবাইকে অবাক করে দিয়ে কোচ রবার্তো মার্টিনেজ রোনালদোকে তুলে নিয়ে রুবেন নেভেসকে নামান। এই পরিবর্তনের ফলে পর্তুগাল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় এবং বারবার আক্রমণ চালাতে থাকে লেয়াওয়ের উইং ধরে।

ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই ঘটে সেই পরম মাহেন্দ্রক্ষণ। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে (৯৪ মিনিট) বাম প্রান্ত থেকে লেয়াওয়ের এক চোখ ধাঁধানো ক্রসে ডিফেন্ডারদের মাথার ওপর লাফিয়ে উঠে বুলেট গতির হেডে গোল করেন গনসালো রামোস। পর্তুগিজ ডাগআউট তখন বুনো উল্লাসে মত্ত।

কিন্তু রোমাঞ্চের শেষ অঙ্ক তখনও বাকি ছিল। ম্যাচের একদম শেষ সেকেন্ডে মারিও পাসালিচের পাস থেকে বল আলতো টোকায় জালে জড়িয়ে পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেন জোসকো গভার্দিওল। সমতার আনন্দে ক্রোয়াটরা যখন লাফাচ্ছে, তখনই বেজে ওঠে ভিএআর-এর অ্যালার্ম। দীর্ঘ স্ক্রিন পরীক্ষার পর রেফারি রায় দেন—পাসালিচ অফসাইড পজিশনে ছিলেন। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ক্রোয়াট সমর্থকেরা মাঠে প্লাস্টিকের বোতল ছুঁড়ে মারলেও ততক্ষণে রেফারির শেষ বাঁশি বেজে গেছে।

২-১ গোলের এই জয় নিয়ে আগামী ৬ জুলাই ডালাসে স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে পর্তুগাল। তবে এই হারের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে অশ্রুসজল চোখে চিরবিদায় নিতে হলো ক্রোয়েশিয়ার সোনালী প্রজন্মের মহানায়ক মদ্রিচকে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত