বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের মঞ্চে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্ব র্যাংকিংয়ের ৬৪ নম্বর দলটির এমন বুক চিতিয়ে লড়াই করার দৃশ্য ফুটবলীয় সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন। মায়ামি স্টেডিয়ামের শ্বাসরুদ্ধকর অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিলেও, তিনবারের বিশ্বজয়ীদের যেভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছিল কেপ ভার্দে, তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অনেকদিন অমলিন থাকবে। প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে এসেই স্পেন ও উরুগুয়ের মতো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রুখে দেওয়া এই আফ্রিকান প্রতিনিধিরা মেসিদের বিপক্ষেও পুরো ১২০ মিনিট সমানে সমানে লড়াই করেছে।
ম্যাচ শেষে কেপ ভার্দের ড্রেসিংরুমের পরিবেশটা ছিল ভীষণ ভারী। যেখানে কান্না আর বিদায়ের বিষাদ একাকার হয়ে গিয়েছিল। তবে এই কান্নার মধ্যেও ছিল বুকভরা গর্ব। দলের স্বপ্নসারথি এবং হেড কোচ বুবিস্তা শিষ্যদের এই লড়াকু মানসিকতায় ভীষণ উদ্বেলিত। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নিজের আবেগ লুকাতে না পেরে এই মাস্টারমাইন্ড বলেন, ‘ড্রেসিংরুমের পরিবেশটা এখন শুধুই বিষাদের। আমরা ম্যাচটা হেরেছি এবং টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিচ্ছি বলেই এই মন খারাপ। কারণ আমরা জয়ের খুব কাছে চলে গিয়েছিলাম, একদমই কাছে। তবে খেলোয়াড়রা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল; এটা আসলে একটা দলের গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া। এই অভিজ্ঞতা আমাদের আরও পরিপক্ব করবে এবং প্রমাণ করে যে এই দলটার একটা নিজস্ব প্রাণ আছে।’
ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্রের এই বীরত্বের অন্যতম নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক ভোজিনহা। আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ যেভাবে তিনি রুখে দিয়েছেন, তা ছিল দেখার মতো। আলবিসেলেস্তেদের বিশ্বসেরা তারকাদের সামনে পোস্টের নিচে যেন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ম্যাচ হেরে মাঠ ছাড়ার সময় তার চোখে জল থাকলেও, পুরো গ্যালারির করতালিই বলে দিচ্ছিল মায়ামির এই মাঠে তিনি কতটা সফল। ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘এখন পুরো বিশ্ব চেনে কেপ ভার্দে কোথায় অবস্থিত। আমরা সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছি যে আমরা ফুটবল খেলতে জানি।’ এই দলের বেশির ভাগ ফুটবলারই বিশ্বের শীর্ষ সারির কোনো লিগে খেলেন না, খেলেন ইউরোপের দ্বিতীয় স্তরের লিগগুলোতে। অথচ মাঠে তাদের আত্মমর্যাদা ও সাহসিকতা ছিল প্রশংসনীয়। বুবিস্তা বলেন, ‘আমি আমার ছেলেদের নিয়ে গর্বিত। তারা মাঠে সাহসিকতা ও মর্যাদার সঙ্গে লড়াই করেছে। আমরা দেখিয়েছি আমাদের মতো ছোট দেশগুলোও যদি চরিত্র ও লক্ষ্য ঠিক রেখে কাজ করে, তবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অস্তিত্ব মেলে ধরা সম্ভব। আমরা বিশ্বকে আজ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচয় দিয়েছি।’ অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি তার ১০০তম ম্যাচে জয়ের পর প্রতিপক্ষের প্রশংসা করে স্বীকার করে জানিয়েছেন, ম্যাচটি মোটেও সহজ ছিল না। ছোট্ট কেপ ভার্দের এই বিদায় তাই স্রেফ কোনো টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়া নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক সম্মানীয় প্রস্থান হিসেবেই লেখা থাকবে।