ডেসকোর ‘জোড়াতালি’র সেবা: ২ বছর ধরে জিম্মি নিকুঞ্জ টানপাড়া পশ্চিমের মানুষ

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০২:৫২ পিএম

রাজধানীর নিকুঞ্জ-২ এর টানপাড়া পশ্চিমপাড়ার এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। গত প্রায় দুই বছর ধরে এলাকাটির হাজারো বাসিন্দা অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) আওতাধীন ZT100 নম্বরের ট্রান্সফরমারটি দীর্ঘদিন ধরেই বর্তমান চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত লোড বহন করছে।

ফলে দিনের যেকোনো সময় কিংবা গভীর রাতেও হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। অভিযোগ জানিয়ে সাময়িকভাবে সংযোগ চালু করা হলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা দিলেও এখন বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। অনেক সময় সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। প্রতিবার ডেসকোর হটলাইনে অভিযোগ জানিয়ে প্রকৌশলী বা কারিগরি কর্মীদের এনে সাময়িকভাবে সমস্যা সমাধান করা হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা কিংবা একদিনের মধ্যেই আবার একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে।

চাহিদা বেড়েছে, বাড়েনি অবকাঠামো

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে টানপাড়া পশ্চিমপাড়ায় দ্রুত নগরায়ণ হয়েছে। একের পর এক বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে, বেড়েছে জনসংখ্যা। একই সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্রিজ, পানির পাম্প, ওভেনসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

কিন্তু এই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ZT100 ট্রান্সফরমারটি দীর্ঘদিন ধরেই তার সক্ষমতার চেয়ে বেশি লোড বহন করছে। ফলে সামান্য চাপ বাড়লেই ট্রান্সফরমার ট্রিপ করে অথবা বিকল হয়ে পড়ে। আর এর পুরো ভোগান্তি বহন করতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের।

'আমরা কি নিয়মিত বিল দিই না?'

স্থানীয় বাসিন্দা নাজমুল হ্যাভেন বলেন, দুই বছর ধরে আমরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছি। দিনে হোক বা রাতে, কখন বিদ্যুৎ চলে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ছোট শিশু ও বয়স্ক মানুষদের নিয়ে গরমে রাত কাটানো খুবই কষ্টকর। আমরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করি। তাহলে কেন এই মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হব? প্রতিবার অভিযোগ দিলে সাময়িকভাবে লাইন ঠিক করা হয়, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আবার একই অবস্থা।

একই এলাকার বাসিন্দা মতিউর রহমান স্বপন বলেন, বিদ্যুৎ না থাকা এখন যেন আমাদের এলাকার নিয়মিত ঘটনা। ফ্রিজের খাবার নষ্ট হচ্ছে, গরমে বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বারবার অভিযোগ করেও স্থায়ী সমাধান পাচ্ছি না। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না, শুধু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও পরিবার

সরেজমিন দেখা যায়, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়। ছোট দোকান, দর্জির কারখানা, সেলুন, ফটোকপির দোকানসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা নিয়মিত ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প চালানো যায় না, ফলে অনেক সময় পুরো এলাকায় পানির সংকটও দেখা দেয়।

বর্তমানে চলছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এই সময় নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে পরীক্ষার্থী ও তাদের পরিবার। অনেক শিক্ষার্থী রাতে পড়াশোনার মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চার্জার লাইট, মোমবাতি কিংবা মোবাইল ফোনের আলোয় পড়তে বাধ্য হচ্ছে। অনেক পরিবারের পক্ষে বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা রাখা সম্ভব নয়।

একই সময়ে চলছে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্ব। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচ চলাকালেও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে খেলা উপভোগ করার সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের ভাষায়, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন শুধু দৈনন্দিন জীবন নয়, মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ-বিনোদনও কেড়ে নিচ্ছে।

'এটি শুধু কারিগরি সমস্যা নয়, সেবার মানেরও প্রশ্ন'

নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল বলেন, রাজধানীর একটি এলাকায় একই সমস্যার সমাধান দুই বছরেও না হওয়া উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, ডেসকো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎসেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু টানপাড়া পশ্চিমপাড়ার বাস্তবতা সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি এলাকার বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে- এটি তো ডেসকোর অজানা থাকার কথা নয়। তাহলে সময়মতো ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা কেন বাড়ানো হলো না?

তিনি আরও বলেন, এখানে সমস্যাটি স্পষ্ট। বর্তমান ZT100 ট্রান্সফরমারটি এলাকার বিদ্যমান লোড বহন করতে পারছে না। তাই বারবার সাময়িক মেরামত করে সমস্যার সমাধান হবে না। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনই একমাত্র কার্যকর সমাধান। আমরা চাই, ডেসকো দ্রুত বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিয়ে এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাক্কের হোসেন বলেন, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা হবে। যদি ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা বৃদ্ধি বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। এলাকাবাসীর ভোগান্তি কমাতে যা যা করণীয়, তা ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করা হবে।

স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশা

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বর্তমান ZT100 ট্রান্সফরমারের পরিবর্তে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন, প্রয়োজনে ফিডার লাইন আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত লোড অডিটের বিকল্প নেই।

খিলক্ষেত টানপাড়া পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দারা জানান, তারা অতিরিক্ত কোনো সুবিধা চান না, চান শুধু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। দুই বছর ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তির পর তাদের প্রত্যাশা, সাময়িক জোড়াতালির পরিবর্তে এবার স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে আসবে ডেসকো।

কারণ, রাজধানীর একটি এলাকায় হাজারো মানুষকে দিনের পর দিন এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে একটি মৌলিক নাগরিক সেবা পরিচালনা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত