এ কেমন খেলা

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৯ এএম

ফিলাডেলফিয়ার তাপমাত্রা তখন ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। তীব্র এই দাবদাহের মধ্যেই ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ে। তবে মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে এই ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল এক রণক্ষেত্রে। যেখানে নান্দনিক পাসিংয়ের বদলে দেখা গেল কনুইয়ের আঘাত, ধাক্কাধাক্কি আর মাঠের চরম বিশৃঙ্খলা। কিলিয়ান এমবাপ্পের ৭০ মিনিটের পেনাল্টি গোলে ফ্রান্স ১-০ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করলেও ম্যাচটিকে ফুটবল ম্যাচের চেয়ে ‘আমেরিকান ফুটবল’ বা এনএফএলের মারকুটে লড়াইয়ের সঙ্গেই বেশি তুলনা করছেন বিশ্লেষকরা।

শুরু থেকেই প্যারাগুয়ে রক্ষণাত্মক ও চরম শারীরিক ফুটবল খেলার কৌশল বেছে নেয়। তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল ফরাসি পোস্টার বয় কিলিয়ান এমবাপ্পে। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে আন্দ্রেস কুবাস আক্রমণভাগে এমবাপ্পেকে জাপটে ধরলে মাঠের ভেতর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের হাতাহাতি ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

এরপর প্রথমার্ধেরই অন্য এক সময়ে বল ছাড়াই এমবাপ্পেকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন মাতিয়াস গ্যালারজা। এখানেই শেষ নয়, ম্যাচের ৭৭ মিনিটে হুয়ান জোসে ক্যাসেরেস সরাসরি লাথি মারেন এমবাপ্পের ডান পায়ের উপরে। ফরাসি মিডফিল্ডার মানু কোনে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ক্যারিয়ারে এত আঘাত, এত নোংরা ট্যাকল আর পেছন থেকে ধাক্কাধাক্কির ম্যাচ কখনো খেলিনি। এটি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন এক পরিস্থিতি ছিল।’ রক্ষণভাগের তারকা উইলিয়াম সালিবা ম্যাচটিকে সংক্ষেপে মূল্যায়ন করে বলেন, ‘আমরা মাঠে ফুটবল নয়, একটা যুদ্ধ লড়েছি। এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধটা আমরাই জিতেছি।’

ম্যাচে প্যারাগুয়ে মোট ১৩টি ফাউল করে এবং ফ্রান্স করে ১১টি। ফরাসিদের ওপর প্যারাগুয়ের একের পর এক নির্মম ট্যাকল সত্ত্বেও উজবেক রেফারি ইলগিজ তানতাশেভ ছিলেন চরম উদার। পুরো ম্যাচে প্যারাগুয়ের কোনো খেলোয়াড়কেই তিনি হলুদ কার্ড দেখাননি, উল্টো ফ্রান্সের তিন খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড পকেট থেকে বের করে দেখান। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর রেফারির সঙ্গে তর্ক করায় প্যারাগুয়ে কেবল একটি হলুদ কার্ড পায়।

ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ে দেশম প্যারাগুয়ের এই রণকৌশল এবং প্রতিপক্ষ বেঞ্চের আচরণে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘ওরা ফুটবলের নিয়মকানুনের বাইরে গিয়ে সব ধরনের নোংরা কৌশল ব্যবহার করেছে। এটা এমন কোনো ফুটবল নয় যা দর্শকদের মাঠে টানবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিপক্ষের ডাগআউট থেকে যেভাবে অনবরত আমাদের গালিগালাজ করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

ম্যাচে একমাত্র গোলটি করার পর প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের সামনে গিয়ে হেসে এক প্রকার ব্যঙ্গ করেন এমবাপ্পে। ম্যাচ শেষেও তার কণ্ঠে ছিল প্রতিপক্ষের প্রতি তীব্র আক্রমণ। টিভি ক্যামেরার সামনে ফরাসি অধিনায়ক বলেন, ‘আমরা দেখিয়ে দিয়েছি যে আমরা কেবল আক্রমণাত্মক ফুটবলই খেলি না। যদি পরিস্থিতি দাবি করে, তবে আমরাও হাত নোংরা করতে জানি। ওরা হয়তো ভেবেছিল আমরা মাঠে ‘ট্যাক্সিডো স্যুট’ (ভদ্রবেশে) পরে খেলতে নামব। কিন্তু আমরাও জানি কীভাবে ‘নোংরা ফুটবল’ খেলতে হয়। এই নোংরা ম্যাচেও আমরা ওদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলাম এবং ম্যাচটা জিতেছি।”

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠের উত্তেজনা রূপ নেয় চরম নাটকীয়তায়। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক ও ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ওর্লান্দো গিল এমবাপ্পের সঙ্গে হাত মেলাতে গেলে এমবাপ্পে তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলে যান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গিল এমবাপ্পের পিঠ লক্ষ্য করে ফুটবল ছুড়ে মারেন। ফলে সেন্ট্রাল সার্কেলে দুই দলের খেলোয়াড়রা আবারও একে অপরের ওপর চড়াও হন।

মিশড জোনে এসে গোলরক্ষক গিল নিজের আচরণের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, ‘আমি ওর সাথে হাত মেলাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ও যেভাবে আমাকে পাত্তা না দিয়ে চলে গেল, আমি নিজের মেজাজ ধরে রাখতে পারিনি। লাতিন আমেরিকায় আমরা এই ধরনের শারীরিক ফুটবলেই অভ্যস্ত। ফরাসিরা শারীরিক সংঘর্ষ পছন্দ করে না, কিন্তু এটাই ফুটবল। আমাদের পরিষ্কার পরিকল্পনা ছিল বল যদি চলেও যায়, মানুষ যেন পার হতে না পারে।”

ম্যাচ শেষে মাঠের সেই তীব্র লড়াই এবার রূপ নিয়েছে আটলান্টিকের দুই পাড়ের সংবাদমাধ্যমের শব্দযুদ্ধে। ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী দুই দৈনিক ‘ল্য মঁদ’ এবং ‘ল্য ফিগারো’ তাদের শিরোনামে লিখেছে ‘প্যারাগুয়ান ফাঁদ’। অন্যদিকে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ছিল ‘ল্য পারিসিয়েন’। প্যারাগুয়ের রক্ষণকে ‘অখেলোয়াড়সুলভ দেয়াল’ আখ্যা দিয়ে তারা ম্যাচের উজবেক রেফারি ইলগিজ তানতাশেভের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়েছে।

ফরাসি মিডিয়ার এসব দাবির বিপরীতে প্যারাগুয়ের সংবাদমাধ্যম দেখাচ্ছে নিজেদের ফুটবলারদের বীরত্ব। দেশটির শীর্ষ দৈনিক ‘এবিসি’ তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘প্যারাগুয়ে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করেছে। ফ্রান্স কেবল তাদের আর্থিক ও খেলোয়াড়ি আধিপত্য দিয়ে আমাদের স্বপ্ন ভেঙেছে।’ অন্য এক জনপ্রিয় পত্রিকা ‘হই’ লিখেছে, ‘আলফারোর সৈনিকরা শুধু ফরাসিদের বুঝিয়ে দিয়েছে, দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলের ঝাঁজ ও জেদ কাকে বলে!’

মাঠের চরম বিশৃঙ্খলার এই ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ফুটবলীয় সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং কুৎসিত লড়াইয়ের এক অনন্য দলিল হিসেবেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে লেখা থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত