লাখ লাখ মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় রাজধানী তেহরানে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রবিবার ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, দেশটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা ও তার পরিবারের চার সদস্যের জানাজায় ইমামতি করেছেন। বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার তিন ছেলে হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ মোস্তফা, সৈয়দ মাসুদ ও সৈয়দ মেয়সাম খামেনিকে তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় কফিনের সামনে জানাজায় অংশ নিতে দেখা গেছে। তবে খামেনির ছেলে ও তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি জানাজায় উপস্থিত ছিলেন না। ইসরায়েল তাকে হত্যা করার হুমকি দেওয়ায়, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তিনি এই জানাজায় অংশ নেননি।
জানাজায় উপস্থিত বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মহসেনি এজেঈ। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান আহমদ ওয়াহিদি এবং আইআরজিসির কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কায়ানিও এই জানাজার নামাজে অংশ নেন। মোনাজাতের সময় মাসুদ পেজেশকিয়ানকে কাঁদতে ও একটি কেফিয়া দিয়ে চোখের পানি মুছতে দেখা গেছে। এর আগে শনিবার তেহরানে ‘ইমাম খামেনি; প্রতিরোধের চিরন্তন নেতা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন খামেনির আদর্শ, ঐক্য ও প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। তার মতে, মুসলিম দেশগুলো যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করত, তাহলে গাজা, লেবানন ও ফিলিস্তিনের মতো অঞ্চলে সংঘাত ও মানবিক সংকট এভাবে চলতে পারত না। তিনি মুসলিম বিশ্বের ঐক্যকে রাজনৈতিক সেøাগান নয়, বরং কৌশলগত প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।
আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দিয়েছিলেন বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিরা। তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, এসব দেশের অংশগ্রহণ ইরানের সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিহাসে ‘একটি চিরস্থায়ী স্মৃতি’ হয়ে থাকবে। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি সম্মান জানাতে ৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি এসেছেন। এর মধ্যে আমাদের বিশ্বস্ত আরব ভাইয়েরাও রয়েছেন। তাদের এ উপস্থিতি ইরানকে আনন্দিত করেছে।’ গত শুক্রবার ইরানি নেতা ও সফররত বিদেশি কর্মকর্তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য খামেনির কফিন একদিন ঘরের ভেতরে রাখার পর গত শনিবার সর্বসাধারণের জন্য বাইরে রাখা হয়। কাঁচ দিয়ে ঘিরে রাখা খামেনির কফিনের পাশে তার মেয়ে সাইয়্যেদা বুশরা হোসেইনি খামেনি, জামাতা মেসবাহ-উল-হুদা বাকেরি, পুত্রবধূ (বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী) জাহরা হাদ্দাদ আদেল ও ১৪ মাস বয়সি নাতনি (বুশরাকন্যা) জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানির কফিন রাখা হয়েছিল।
এদিকে, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায়ে ইরানিদের কান্না দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি ভাবতাম মানুষ খামেনিকে ঘৃণা করে।’ তবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তিনি আরও বলেন, হতে পারে ওগুলো সব মায়াকান্না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানিরা খামেনিকে ঘৃণা করে বলেই জানতেন তিনি। ট্রাম্প আরও বলেন, খামেনির শেষ বিদায়ী অনুষ্ঠান চলাকালে দেশটির অবশিষ্ট নেতৃত্বকে ‘এক হামলায়’ নির্মূল করা সম্ভব। তবে ট্রাম্প বলেছেন তিনি তা করবেন না, কারণ তাহলে আলোচনার জন্য ‘কেউ অবশিষ্ট থাকবে না’। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের তীব্র জবাব দিয়েছে আর্মেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানি দূতাবাস। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, মানুষকে হত্যা করা যায়; কিন্তু আদর্শকে নয়। যুক্তরাষ্ট্র খামেনিকে হত্যা করলেও তার আদর্শের সুবাস সুগন্ধি আতরের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
জানাজা উপলক্ষে গতকাল রবিবার ইরানে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। সন্ধ্যায় প্রয়াত নেতার মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে স্থানান্তর করা হয়। আজ সোমবার রাজধানীজুড়ে শোক মিছিল হবে। শোক মিছিল শেষে আগামীকাল মঙ্গলবার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কফিন নিয়ে যাওয়া হবে ইনানের পবিত্র ধর্মীয় শহর কোম নগরীতে। এরপর বুধবার কফিন নেওয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে শোকযাত্রা হবে নাজাফ ও কারবালা শহরে। সেখানে শোকাহত মানুষ তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন। পরে আগামী ৯ জুলাই জন্মস্থান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে খামেনির মরদেহ ফিরিয়ে আনা হবে। সেখানে ইমাম রেজার মাজারের পাশে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।