কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবে না এবং দলটিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে বলে গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার এই বক্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে আওয়ামী লীগকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার ইস্যুটি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলটিকে আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করলে প্রতিক্রিয়া সূদরপ্রসারী হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে চলে যেতে পারে দেশ।
অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞদের মত হলো, কোন আইনে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করা হবে, তা অস্পষ্ট। এ ছাড়া বিচারিক প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হলেও তা রাজনীতির জন্য ভালো বার্তা দেবে না। এর মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে অমোচনীয় সংকট ও ক্ষতের সৃষ্টি হতে। তারা মনে করছেন, সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার হতে পারে। তবে এই কারণ দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগের বিচার দেশ, গণতন্ত্র ও রাজনীতির জন্য শুভ হবে না।
জার্মানিতে নাৎসি বাহিনীকে নিষিদ্ধ করার উদাহরণ টানা হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর অপরাধ আর ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের অপরাধ এক নয়। আওয়ামী লীগের যেসব নেতা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের বিচার হতে পারে। এ দিকে সংগঠন হিসেবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হবে কি না, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণহত্যার বিচারের কথা বলা হলে এ দেশে গণহত্যার জন্য সবচেয়ে বড় অপরাধ জামায়াতের। তাদের বিচার হয়নি। তারা এখন সংসদে বিরোধী দল। সরকার আওয়ামী লীগের বিচার করার ব্যাপারটিকে সামনে আনছে। কীভাবে আওয়ামী লীগের বিচার করা হবে তা চিন্তার বিষয়। নাৎসি বাহিনীর উদাহরণ আমরা দিই, কিন্তু নাৎসি বাহিনীর অপরাধ ২০২৪ সালের অপরাধের সঙ্গে যায় না।’
সরকার ও বিএনপির দায়িত্বশীল জায়গা থেকে কোনো দলকে রাজনীতিতে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা অথবা বিচারের কাঠগড়ায় তোলার ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘বিচারের আগে এসব কথা বলার অর্থ বিচারকাজকে প্রভাবিত করা। এ ধরনের কথা ভেবেচিন্তে বলা উচিত। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকে। আওয়ামী লীগের যারা অপরাধ করেছেন তাদের বিচার হতে পারে। কিন্তু আমরা দেখছি ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে বিচারের নামে হয়রানি করা হচ্ছে। এমন সব মামলা দেওয়া হয়েছে অথবা আটক-বাণিজ্য করা হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।’
অন্যদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, কোন আইনে কীভাবে আওয়ামী লীগের বিচার করা যাবে সেটি অস্পষ্ট। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ পর্যন্ত শুধু শুনেই আসছি আওয়ামী লীগের বিচার করা হবে। অথচ কোন আইনে, কোন অপরাধে বিচার হবে সেটি স্পষ্ট করে কারও মুখে শুনিনি। নিয়মিত আইনে বিচার হবে, নাকি বিশেষ আইনে হবে সেটিও জানি না। পৃথিবীতে কোনো দলকে বিচারের মুখোমুখি করা ও আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার নজির আমার জানা নেই।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শনিবারের অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, রাজনৈতিক দলের ও সংগঠনের বিচার করার জন্য সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ৩২ হাজার পৃষ্ঠার আইনের বই আছে। সব আইন তো মুখস্থ করে রাখাও সম্ভব নয়। যেসব আইনে নিয়মিত মামলা হয় সেগুলো আমি জানি, মনে থাকে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে যদি বিচার করা হয়, সেটি আরও ভালো করে জানতে হবে।’
আদালতের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হলে রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী বিপজ্জনক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ পতনের পর দলটির বিচার নিয়ে মাতামাতি অথবা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর উদ্যোগে দেশকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া ছাড়া কোনো সুফল আনবে না। এ দেশে আওয়ামী লীগের বিচার হওয়ার আগে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের সহযোগী ফোর্স হিসেবে কাজ করা জামায়াতের বিচার হতে হবে।’
বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আওয়ামী লীগের বিচার করা সম্ভব নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমরা মানি, আর না মানি এ দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার পেয়েছি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে। গত দেড় দশক আওয়ামী লীগের অনেক নেতা অপরাধ করেছেন, তাদের বিচার হতে পারে। তবে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার ও তাদের নিষিদ্ধ করা হলে রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষত সৃষ্টি হবে।’
এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘দুই বছর ধরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের ঘৃণা জাগরূক আছে। কিন্তু দলটির বিচার হবে, অথবা তাদের নিষিদ্ধ করার বিষয়টিতে আমরা ঐকমত্যে আসতে পারিনি। এগুলো কেবল বলাবলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। দেখা যাক, কীভাবে শুরু হয় বিচার কাজ, কোথায় গিয়ে তা থামে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়ন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. শাহিদুজ্জামান মনে করছেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের জন্য যেভাবে জনমত গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল তা হয়নি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মতো শক্তিশালী একটি দলকে বিচারের মুখোমুখি করা, নিষিদ্ধ করা মুখের কথায় হয়ে যাবে না। এর জন্য যথেষ্ট গ্রাউন্ডওয়ার্ক করা প্রয়োজন, জনমত গড়ে তোলা দরকার। সেগুলোর কোনোটিই এ পর্যন্ত করা হয়নি।’
আ.লীগের বিচার হবে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে : সংগঠন হিসেবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হবে কি না, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। গতকাল ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের কনফারেন্স কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে দলের বিচার ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দল নিষিদ্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংগঠনের বিচার এবং দল নিষিদ্ধ করার যে প্রক্রিয়া, এগুলো সব কিছুই আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় এসে আইন প্রণয়ন করেছে। সংবিধান সংশোধন করেছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বাকশাল কায়েম করে একদলীয় শাসন করেছিল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তারা বাংলাদেশে একটা ফ্যাসিজম রাষ্ট্র কায়েম করেছিল। এই ফ্যাসিজমের মধ্য দিয়ে জনগণের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক কর্মকা- সব কিছু কেড়ে নিয়েছিল তারা। দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ অন্য অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এমন একটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন যে, ১৬ বছর মানুষের কোনো স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা ও রাজনৈতিকব্যবস্থা ছিল না। তিনটি নির্বাচনের কোনোটি রাতের, কোনোটি একদলীয়, কখনো আমি-ডামি নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তারা নির্বিচারে ছাত্র-জনতার ওপর তাদের সরকারের বিভিন্ন বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে তাদের সাংগঠনিকভাবে ছাত্রলীগ, যুবলীগ জনগণের জানমালের ওপর আক্রমণ করেছে এবং হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দল হিসেবে যেমন নানা অপরাধ করেছে, ঠিক একইভাবে নানা অপরাধে ব্যক্তিগত দায় থেকে অপরাধ করেছে। আইন অনুযায়ী এগুলোর বিচারের ব্যবস্থা আছে। সেটা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, যেগুলো আওয়ামী লীগই করেছিল এবং তাদেও তৈরি আইনেই এসব অপরাধের বিচার সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘জনৈক ব্যক্তি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেই অভিযোগটি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সংস্থা সেটার তদন্ত করছে। পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে পুলিশের আলাদাভাবে তদন্তের সুযোগ আছে।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার হবে কি হবে না, সে বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত করছে। তদন্ত চলমান আছে। তদন্তের পর যদি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া যায়, আমার কাছে প্রতিবেদন আসে, প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ আছে।’