বুদ্ধিবৃত্তিতে শূন্যতা বাড়বে

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:১২ এএম

আবুল কাসেম ফজলুল হক শুধু অত্যন্ত স্নেহভাজনই নয়, আমার আপনজনও ছিলেন। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল প্রাণের। সেজন্য তার এই প্রয়াণ, প্রস্থান ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য গভীর শোক ও মর্মবেদনার।

আবুল কাসেম ফজলুল হককে অনেক দিন ধরেই চিনি। তিনি যখন ছাত্র, তখন থেকেই তাকে জানি। ছাত্রাবস্থাতে এবং বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবনে যাদেরকে চিন্তা করতে দেখেছি, যারা চিন্তা করেন এবং লেখেন তাদের মধ্যে আবুল কাসেম ফজলুল হক অন্যতম। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ, চিন্তাশীল এবং গবেষণামনস্ক। সমাজ পরিবর্তনে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন।

ছাত্রজীবনেই ফজলুল হক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, রাজনীতি বিষয়ে চিন্তা করতেন এবং লিখতেন। তবে পরবর্তীতে তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হননি এবং যুক্ত থাকেনওনি। কিন্তু তার রাজনীতি মনস্কতা সবসময়ই ছিল। তিনি রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে চিন্তা করতেন। তার ভাবনায় ছিল কী করে সমাজকে বদল করা যায়, সে বিষয়ে তিনি লিখতেনও। কেবল চিন্তা করাই নয়, সেই চিন্তাকে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেই তার লেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সময়ে যারা সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে ভাবতেন, সমাজ বদলের চিন্তা করতেন, একটি সুষ্ঠু-স্বাভাবিক বৈষম্যহীন সমাজের ভাবনা যাদের ছিল, আমাদের যে সমস্ত শিক্ষক বা আমাদের কনিষ্ঠ যারা এসব নিয়ে বলতেন, লিখতেন ফজলুল হক ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি নিজের সম্পাদনায় ছোট আকারে হলেও একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। একক ইচ্ছা ও চেষ্টায় লোকায়ত নামের পত্রিকাটির প্রকাশনা অনেক দিন চালিয়ে গেছেন।

ফজলুল হকের চিন্তাধারার একটি নিজস্বতা ছিল। সেই নিজস্বতার কারণেই তিনি কোনো সংঘবদ্ধ লেখক গোষ্ঠীর সঙ্গেও সম্পর্ক রাখেননি। নিজে নিজেই চিন্তা করতেন এবং নিজের কথা বলতেন।

বিভিন্ন সময়ে তাকে দেখেছি। তার স্ত্রীও আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। তাদেরকে বিশেষ করে দেখেছি তাদের সন্তান ফয়সল আরেফিন দীপনের মৃত্যুর সময়ে। যেরকম নৃশংসভাবে দীপনকে হত্যা করা হয়েছিল, ওই সময় তার ভেঙে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন। ছেলেটি খুব কর্মঠ ছিল। সে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করত। আমাদের বইও প্রকাশ করেছে। কিন্তু তাকে যে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, সে ঘটনায় আমরা সকলেই অত্যন্ত কাতর হয়েছিলাম। বাবা হিসেবে ফজলুল হকেরও তো কাতর হবারই কথা। কিন্তু তিনি ওই সময়েও যে দৃঢ় মনোবল দেখিয়েছেন, সেটা আমার কাছে খুবই প্রশংসার মনে হয়েছে। জানি না, এত বড় শোক তিনি কীভাবে বহন করলেন। সে সময়ে এবং পরেও তিনি একেবারেই ভেঙে পড়েননি। এটা আমাকে খুবই স্পর্শ করেছে। আর ওই সময়ে তিনি যেটা করলেন, সেটা হলো অশুভবুদ্ধির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিলেন। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সাধারণ মানুষ যেন বিড়ম্বনা, অপমান এবং অসহায় বোধ না করেন, সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেন।

ফজলুল হক ইচ্ছা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে সব সময় নিজের কাজটি করতেন। তিনি ছিলেন নানা গুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। একাধারে চিন্তাশীল গবেষক, লেখক এবং ভালো শিক্ষক। তিনি রাজনীতি সচেতন ছিলেন এবং চিন্তা করতেন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। দেশের পরিবর্তনের বিষয়ে ভাবতেন। তার চিন্তাধারায় মৌলিকত্ব ছিল। এ রকম সমন্বয় বাংলাদেশে খুব বেশি দেখা যায় না, এ একটা বিরল ঘটনা।

বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে আমরা এমনিতেই বেশ দুর্বল অবস্থানে রয়েছি। আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যু এই চর্চার ক্ষেত্রে একটা গভীর ক্ষত এবং ক্ষতি। এ রকম ক্ষতির ভারে আমাদের এই সমাজ আরও পিছিয়ে পড়বে। সমাজ পরিবর্তনের বিশ্বাসী, এমন গবেষণামনস্ক মানুষের বড় অভাব আজ। তার মৃত্যুতে বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ক্ষেত্রে শূন্যতাটা অনেক বাড়ল। তার মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

লেখক : সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত