বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল রবিবার বিকেল ৩টার দিকে পরিবারের সঙ্গে মিরপুরে একটি রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত ওই ভবনে অবস্থিত ক্লিনিকে এবং পরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
অধ্যাপক আবুল কাসেম স্ত্রী ফরিদা প্রধান, মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শুচিতা শারমিন, পুত্রবধূ রাজিয়া রহমান, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার একমাত্র পুত্র ফয়সল আরেফিন দীপন একজন সৃজনশীল প্রকাশক, জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ছিলেন। ঢাকার শাহবাগে প্রকাশনা সংস্থাটির কার্যালয়ে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর তাকে হত্যা করে জঙ্গিরা। দেশবরেণ্য এ অধ্যাপকের মৃত্যুর খবর পেয়ে সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীসহ অনেকে তার মিরপুরের পল্লবীর বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না দেন।
আবুল কাসেম ফজলুল হক নিরপেক্ষ রাজনৈতিক চিন্তা ও তত্ত্বের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। জীবনভর সচেষ্ট ছিলেন জাতির শুভবোধ জাগ্রত করার প্রয়াসে। ঘাতকের হাতে নিজের সন্তানের মৃত্যুর পরও তিনি বলেছিলেন, ‘শুধু খুনিদের বিচার করে কোনো সমাধান হবে না। আমি চাই, জাতির শুভবোধ জাগ্রত হোক।’
সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই বুদ্ধিজীবীর প্রতি আজ সোমবার একাধিক স্থানে শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়াতের মরদেহ সকাল সাড়ে ১০টায় বাংলা একাডেমিতে নেওয়া হবে। এরপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তার মরদেহ রাখা হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত রাখা হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে জানাজা। এর পর তাকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হবে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে দেশ একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও লেখককে হারাল। তার মৃত্যুতে দেশের শিক্ষা অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
আবুল কাসেম ফজলুল হক জীবনের চার দশক অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। এ বিভাগের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হিসেবে ২০১১-১৫ সাল পর্যন্ত একই বিভাগে কর্মরত ছিলেন। দুই বছর (২০২১-২৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে আহমদ শরীফ চেয়ার পদে নিয়োজিত ছিলেন।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের জন্ম ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায়। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ষাটের দশকের শেষ দিকে তিনি মার্ক্সবাদী ধারার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন ষাটের দশকের প্রগতিশীল সব আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ঢাকা শহরে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও অর্থ সংগ্রহ করে দিয়ে সহযোগিতা করেন। স্বাধীনতার পর আর তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হননি।
অধ্যাপনা, লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ও সমাজ পরিবর্তনের নানামাত্রিক কাজে যুক্ত ছিলেন। বুদ্ধি মুক্তির আন্দোলন অব্যাহত রাখায় প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিতে সোচ্চার রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। আহমদ শরীফ প্রতিষ্ঠিত স্বদেশ চিন্তা সংঘের সভাপতির দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন।
সমাজের পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক সংকট, মুক্তচিন্তা এবং নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তৈরিই ছিল তার লেখার মূল অনুষঙ্গ। এসব বিষয়ে তার ৩২টির মতো চিন্তামূলক মৌলিক বই প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’ প্রভৃতি। রাষ্ট্র ও সমাজ চিন্তাবিষয়ক ‘রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ’, নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি’, ‘অবক্ষয় ও উত্তরণ’, ‘মানুষের স্বরূপ’, ‘আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ প্রভৃতি। রয়েছে রাজনীতিবিষয়ক বই ‘মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’, ‘বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’, বার্ট্রান্ড রাসেল প্রণীত : রাজনৈতিক আদর্শ’।
সাহিত্যবিষয়ক বই ‘উনিশশতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য’, ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’ যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক বই ‘রাজনীতি ও সংস্কৃতি : সম্ভাবনার নবদিগন্ত’, ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে’, ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’, সম্পাদিত গ্রন্থ ‘ইতিহাসের আলোকে বাঙলাদেশের সংস্কৃতি’।
লেখালেখির জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান ১৯৮১ সালে।
সামাজিক অবক্ষয়, রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে তিনি পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখেছেন নিয়মিত।
আশির দশক থেকে ‘লোকায়ত’ নামে একটি মননশীল পত্রিকার সম্পাদনা করে আসছিলেন।
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
তার মৃত্যুতে বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা শোক প্রকাশ করেছেন। শোক প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি।