বিশ্বকাপ জ্বরে কাঁপছে সারা বিশ্ব। নিতান্ত সাধারণ পরিবার থেকে জন্ম নিয়ে তারকা হয়ে যাওয়ার নজির ফুটবল বিশ্বে কম নেই। বর্তমান ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা মেসি ও রোনালদো, দুজনই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বেড়ে ওঠা ও সংগ্রামমুখর জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায় দুজনই দৈবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। লিখেছেন এজাজ পারভেজ
ফুটবল বিশ্বের ফেভারিট দলগুলোর পাশাপাশি নবীন দলগুলোও চমক দেখাচ্ছে। সেসব নিয়ে সরগরম চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। প্রিয় দলের প্রিয় খেলোয়াড়ের পক্ষে তথ্য আর পরিসংখ্যানের উপাত্ত হাজির করে নিজের পছন্দের তারকাই শ্রেষ্ঠ তা প্রমাণে ব্যস্ত সমর্থকরা। শুধু বিশ্বকাপের সময় নয়, গত দেড় দশক ধরেই সাধারণ সমর্থক থেকে শুরু করে ফুটবল খেলার সমঝদার ও বিশেষজ্ঞরাও মেতেছেন ‘কে বড় খেলোয়াড় মেসি নাকি রোনালদো’ এই তর্কে। ভক্তদের দাবি ভিন্ন হলেও, মেসি ও রোনালদো দুজনের ভেতরেই এমন কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাদের অনন্য করে তুলেছে।
ফুটবল খেলা নিষেধ ছিল রোনালদোর
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্ম ১৯৮৫ সালে। জন্মেছিলেন পর্তুগালের ফানচালে এক গরিব পরিবারে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বাবা হোসে দিনিস আভেইরো ছিলেন একজন খ-কালীন মালি। তার মা মারিয়া দোলোরেস দস সান্তোস আভেইরো পরিবারকে সাহায্য করার জন্য রান্না ও বাসন পরিষ্কারের কাজ করতেন। বাবার কাছ থেকে রোনালদো ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাটা পান। বাবা পর্তুগালের স্থানীয় ক্লাব আন্দোরিনহা’র সরঞ্জাম ব্যবস্থাপক (কিট ম্যানেজার) হিসেবেও কাজ করতেন। ছোটবেলায় ফুটবল পেলে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যেতেন। রোনালদো তাদের লোকাল টিম আন্দোহিনাতে তিন বছর খেলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে পর্তুগালের নামি ক্লাব স্পোর্টিং সিপি তাকে দেড় হাজার পাউন্ড ফি দিয়ে সাইন ইন করে নেয়।
সেখানে তার ক্যারিয়ার ভালোই এগোচ্ছিল। কিন্তু পথ আটকে দাঁড়ায় নিয়তি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তার একটি রোগ ধরা পড়ে। এই রোগের নাম রেসিং হার্ট প্রবলেম। এটি এমন একটি রোগ যে রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হৃদপি- বিশ্রামের সময়ও স্বাভাবিক মানুষের হৃদপি-ের থেকে বেশি গতিশীল থাকে। তাকে পরীক্ষা করে ডাক্তাররা পরামর্শ দেন, আর ফুটবল না খেলতে। এই রোগের ভয়াবহতা বোঝাতে তারা রোনালদোকে বলেন, এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে এর আগেও অনেক ফুটবল খেলোয়াড় মৃত্যুবরণ করেছেন।
কিন্তু রোনালদো হাল ছাড়েননি। ফুটবল ছাড়া নিজেকে এক মুহূর্তেও কল্পনা করতে পারতেন না তিনি। তিনি চিকিৎসকদের কাছে জানতে চান এই রোগ থেকে নিরাময়ের জন্য আর কোনো উপায় আছে কি না। চিকিৎসকরা তাকে জানান, একটি উপায় আছে। কিন্তু তা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। একটি অপারেশনের মাধ্যমে এর সমাধান হতে পারে। তবে তার সফলতার পরিমাণ খুবই কম। কিন্তু রোনালদো ঝুঁকি নিয়ে অপারেশনটি করানোর সিদ্ধান্ত নেন। তার অপারেশন সফল হয় এবং এর ফলে তিনি আবার ফুটবল খেলা চালিয়ে যাওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পান।
রোনালদোর জীবন সংগ্রাম এখানেই শেষ নয়। তরুণ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পর্তুগালের লিসবনে স্পোর্টিং একাডেমিতে পড়ার সুযোগ পান। পড়ার সুযোগ পেলেও সেখানে জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়া তার পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ কারণে প্রায়ই রাতের খাবার জোগাড় করতে পারতেন না। এজন্য প্রায় সময়ই রাতে না খেয়ে থাকতে হতো তাকে। সে সময় তাদের এই অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন সেখানকার একটি রেস্টুরেন্টের কয়েকজন কর্মী। তারা পরবর্তী সময়ে রেস্টুরেন্টের বেচে যাওয়া স্যান্ডউইচ বিনামূল্যে রোনালদোদের দিতেন। অর্থের অভাবে সেই বেচে যাওয়া স্যান্ডউইচ খেয়েই দিন কাটিয়েছেন সেদিনের দারিদ্র্যতাড়িত ক্রিশ্চিয়ানো।
দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন মেসি
লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে হোরাসিও আর্জেন্টিনার রোজারিওতে ইস্পাতের কারখানায় কাজ করতেন। মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি ছিলেন খ-কালীন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এই দম্পতির তৃতীয় সন্তান মেসি। একদম ছোটবেলা থেকেই মেসি ফুটবল খেলতে শুরু করেন। এ বিষয়ে যে তার সহজাত প্রতিভা রয়েছে বাবা-মা সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। পাঁচ বছর বয়সেই তিনি স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলির হয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেন। এই ক্লাবের কোচ ছিলেন তার বাবা। ফুটবলে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শনের কারণে তিনি ‘দ্য মেশিন অব ৮৭’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তার জন্ম সাল ছিল ১৯৮৭। সবাই মনে মনে ধরেই নিয়েছিল এই ছেলে একদিন বড় খেলোয়াড় হবে। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম পরিহাস মাত্র ১১ বছর বয়সে মেসির শরীরে গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি রোগ ধরা পড়ে। এই দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। সে সময় এই ব্যয় ছিল প্রতি মাসে প্রায় ৯০০ ডলার। স্থানীয় ক্লাব রিভার প্লেট মেসির প্রতি আগ্রহ দেখালেও প্রতি মাসে এই বিশাল ব্যয় বহন করতে প্রস্তুত ছিল না। সে সময় এফসি বার্সেলোনার স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লস রেসজ্যাগ মেসির ফুটবল প্রতিভা সম্পর্কে জানতে পারেন। মেসি ও তার বাবা এফসি বার্সেলোনা টিমের সঙ্গে একটা ট্রায়াল অ্যারেঞ্জ করতে সফল হন। প্রথমবারেই বার্সার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ না পেলেও এর দুই বছর পর মেসি বার্সেলোনার সঙ্গে প্রথম চুক্তিবদ্ধ হন। তার এই প্রথম চুক্তিবদ্ধ হওয়াটাও ব্যতিক্রমী ঘটনা। মেসি যে বার্সালোনায় যোগ দিতে যাচ্ছে এই সুখবর জানানোর জন্য বার্সালোনার স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লস রেসজ্যাগ মেসি ও তার বাবাকে এক ডিনারে আমন্ত্রণ জানান। এই সুখবর জানার পরে মেসি এতটাই উৎসাহিত ছিলেন যে, তিনি চেয়েছিলেন ডিনার শেষ হওয়ার আগেই যেন তাকে সাইন করিয়ে নেওয়া হয়। তার ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে কার্লস রেসজ্যাগ তখনই রেস্তোরাঁর একজন ওয়েটারকে ডেকে তার কাছ থেকে একটা ন্যাপকিন নিয়ে তাতে একটা কন্ট্রাক্ট লিখে ফেলেন। ওই ন্যাপকিনেই সাইন করে মেসি বার্সেলোনাতে যোগ দেন।
হার না মানা তাদের স্বভাব
একদম সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্বসেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য এই দুজনকেই যেমন লড়তে হয়েছে চারপাশের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তেমনি দৃঢ় মনোবলের সাহায্যে পরাজিত করতে হয়েছে নিয়তির লিখনী। দুজনেই ছেলেবেলায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। দুজনেই দীর্ঘসময় ধরে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়ের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। খেলোয়াড়ের জীবনে যে বয়সকে পড়ন্ত সময় বলে অভিহিত করা হয় সে সময়েও তারা দলকে জেতাতে নিয়মিত গোল করে যাচ্ছেন। এই দুজন খেলোয়াড়ই ছোটবেলা থেকেই ফুটবলকেই নিজের ধ্যানজ্ঞান মেনেছেন এবং কঠোর পরিশ্রম করেছেন। এমনকি দুরারোগ্য ব্যাধির কাছেও হার মানেননি। তারা দুজনেই পরিশ্রমকে সফলতার মাধ্যম হিসেবে মেনেছেন। মেসি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অনেক যুদ্ধের মোকাবিলা করতে হবে। তোমাকে অনেক বেশি ত্যাগ স্বীকার এবং কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।’ রোলানদোও একই কথা বলেছেন, সব সময় চেষ্টা করা উচিত বেস্ট হওয়ার জন্য। আর সেটা হতে আমি কঠোর পরিশ্রমও করি।’
অক্লান্ত পরিশ্রম আর লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকে তারা সফলতার চূড়ায় পৌঁছেছেন। অনেক বিষয়েই তাদের অমিল থাকলেও এই এক জায়গায় তারা অভিন্ন। দৃঢ় মনোবল আর অধ্যবসায় দিয়ে তারা দৈবকেও পরাজিত করেছেন, হয়েছেন কিংবদন্তি।