আজতেকা জয় করল ‘নতুন’ ইংল্যান্ড

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩১ এএম

১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ কিংবা ডিয়েগো ম্যারাডোনার শতাব্দীর সেরা গোলÑ ফুটবল মানচিত্রে মেক্সিকোর এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামটি ইংলিশ ফুটবলের জন্য সব সময়ই ছিল এক দুঃস্বপ্নের নাম। দীর্ঘ ৪০ বছর পর সেই একই আঙিনায়, প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট উচ্চতার পাতলা বাতাস আর আশি হাজার মেক্সিকান সমর্থকের তৈরি নরক গুলজারের সামনে দাঁড়িয়েছিল ইংল্যান্ড। তবে এবার আর কোনো ট্র্যাজেডি নয়; বজ্রঝড়, বৃষ্টি আর দ্বিতীয়ার্ধে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার অবর্ণনীয় মানসিক চাপ সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধে মেক্সিকোকে ৩-২ ব্যবধানে স্তব্ধ করে দিল এক নতুন ধাঁচের ইংলিশরা।

ম্যাচ শুরুর আগেই আকাশভাঙা বজ্রঝড় আর প্রবল বৃষ্টি খেলা পিছিয়ে দেয় এক ঘণ্টা। এদিকে ঘরের মাঠে মেক্সিকোর অজেয় দুর্গের সুবিধা নিতে তাদের সমর্থকরা ইংলিশদের হোটেলের সামনে সারা রাত ভুভুজেলা বাজিয়ে ঘুমাতে দেয়নি। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরু হতেই সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দেন জুড বেলিংহাম। প্রথমার্ধে মাত্র ৯৮ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি গোল করে পুরো আজতেকা স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। এরপর হুলিয়ান কিনোনিয়োসের গোলে মেক্সিকো ব্যবধান কমালে ম্যাচে প্রাণ ফেরে।

আসল নাটকীয়তা শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধে। ৫৪ মিনিটে জ্যারেল কোয়ানসার লাল কার্ডে ইংল্যান্ড পরিণত হয় ১০ জনের দলে। সেখান থেকে হ্যারি কেইনের পেনাল্টিতে ইংল্যান্ড ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে গেলেও, কেইনেরই করা ফাউল থেকে পেনাল্টি পেয়ে রাউল জিমেনেজ মেক্সিকোকে আবার ম্যাচে ফেরান। শেষ ২০ মিনিট ও অতিরিক্ত ১১ মিনিটের ম্যারাথন সময়ে ১০ জনের রক্ষণাত্মক ‘৫-৩-১’ দেয়ালে মেক্সিকোর একের পর এক আক্রমণ আছড়ে পড়লেও গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড ও ড্যান বার্নরা যেভাবে গোলপোস্টের সামনে প্রাচীর তুললেন, তা টমাস টুখেলের ফুটবল দর্শনের এক নতুন যুগেরই ইঙ্গিত দেয়।

থ্রি লায়ন্সদের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে ড্রেসিংরুমে যাওয়ার আগে ভাঙা ও প্রায় বসে যাওয়া গলায় ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন বলেন, ‘আমি কেবল গান গাইছিলাম, এখন আর ঠিকমতো কথা বলতে পারছি না। আবহ, প্রতিপক্ষ দল, গ্যালারি সবকিছুই আমাদের বিপক্ষে ছিল, কিন্তু আমরা একটা পথ খুঁজে নিয়েছি। দলের এই ইস্পাতকঠিন মানসিকতাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।’

এদিকে ম্যাচের সেরা তারকা বেলিংহাম এটিকে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সেরা রাত উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা আজ রাতে অবিশ্বাস্য কিছু করেছি, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমি এই দলের জন্য সত্যিই গর্বিত।’

অন্যদিকে, ঘরের মাঠে মেক্সিকোর ৪০ বছরের দুর্গ ভেঙে পড়ার বেদনায় ভেঙে পড়েছেন কোচ হাভিয়ের আগুয়েরে। এই টুর্নামেন্ট দিয়েই মেক্সিকো অধ্যায়ের ইতি টানা এই অভিজ্ঞ কোচ হারের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে ভবিষ্যৎ কোচ হিসেবে রাফা মারকুয়েজের ওপর আস্থা রাখার ইঙ্গিত দেন। আগুয়েরে বলেন, ‘এভাবে স্বপ্নভঙ্গ হওয়াটা ভীষণ কষ্টের। তবে ছেলেরা সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিল। আমি অনেক গর্ব নিয়ে বিদায় নিচ্ছি, কারণ এই দলটা দেশের মানুষকে আবার ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। আর রাফার মারকুয়েজ) প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রইল। সে এই দলের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য শতভাগ যোগ্য এবং সে আমার চেয়েও ভালো করবে।’

কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের মুখোমুখি হওয়ার টিকিট কেটে ইংলিশদের ডাগআউটে বসা কৌশলী টুখেল যেন খুঁজে পেয়েছেন তার কাক্সিক্ষত দলটিকে। মেক্সিকোর উচ্চতা ও প্রতিকূলতা জয়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পাতলা বাতাসে স্বাগতিক দেশের শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ১০ জন নিয়ে ৪০-৫০ মিনিট লড়াই করা মোটেও সহজ নয়। যখন পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যায়, এই ছেলেরা তখন হাল ছাড়ে না, বিশ্বাস হারায় না। এটা স্রেফ মানসিকতা আর হৃদয়ের জয়।’  তবে জয়ের এই আনন্দ কিছুটা মøান হয়েছে অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার জর্ডান হেন্ডারসনের গুরুতর ইনজুরিতে। ম্যাচ শেষে সমর্থকদের সঙ্গে গ্যালারির বিজ্ঞাপনী বোর্ডে লাফিয়ে উদযাপনের সময় কবজিতে মারাত্মক চোট পান তিনি, যাকে ম্যাচ শেষেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

অবশ্য আজতেকা জয় করে ইংলিশরা এখন আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। মেক্সিকোকে তাদের নিজ ডেরায় বোতলবন্দি করা টুখেলের ইংল্যান্ড এখন ট্রফির খোঁজে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে আগামী ১২ জুলাই মায়ামিতে লড়বে ব্রাজিলকে হারানো নরওয়ের বিপক্ষে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত