মানসিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৪ এএম

বিশ্বকাপ যতই শেষের দিকে এগোচ্ছে, প্রতিটি ম্যাচ ততই কঠিন হয়ে ওঠে। এ পর্যায়ে কেউ ভাগ্যের জোরে আসে না। প্রতিটি দলই নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করেই জায়গা করে নেয়। তাই শেষ ১৬-তে আর্জেন্টিনা ও মিসরের লড়াইকে আমি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ হিসেবে দেখি না। এটি অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস, কৌশল ও মানসিক দৃঢ়তার লড়াই।

কাগজ-কলমে আর্জেন্টিনা এগিয়ে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বকাপের ইতিহাস, বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা এবং তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড সবকিছুই তাদের পক্ষে কথা বলে। কিন্তু ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে অতীতের অর্জন বর্তমানের জয় নিশ্চিত করে না। মাঠে ৯০ মিনিট যে দল নিজেদের পরিকল্পনা সবচেয়ে ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তারাই শেষ পর্যন্ত হাসে। আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দলীয় বোঝাপড়া। একসময় এ দল একজন বা দুজন তারকার ওপর অনেক বেশি নির্ভর করত। এখন সেই চিত্র বদলেছে। রক্ষণভাগ থেকে শুরু করে আক্রমণভাগ পর্যন্ত সবাই একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসরণ করে। বল হারালেও দ্রুত তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে, আবার বল পেলে ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ে তোলে। আধুনিক ফুটবলে এ ভারসাম্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ।

অবশ্যই অধিনায়ক লিওনেল মেসি এখনো এ দলের হৃদস্পন্দন। বয়স বাড়লেও খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বড় ম্যাচে একজন অধিনায়কের সবচেয়ে বড় কাজ হলোÑ দলের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা। সেই কাজটি মেসি বছরের পর বছর ধরে করে আসছেন।

তবে আমি মনে করি, আর্জেন্টিনার জয় নির্ভর করবে শুধু মেসির ওপর নয়। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণভাগের শৃঙ্খলা এবং ফরোয়ার্ডদের ফিনিশিং সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নকআউট পর্বে একটি সুযোগ নষ্ট করার মূল্য অনেক বড় হতে পারে।

অন্যদিকে মিসরকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আফ্রিকার ফুটবল অনেক বদলে গেছে। এখন তারা শুধু গতি কিংবা শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। কৌশলগত দিক থেকেও তারা অনেক পরিণত। মিসরের খেলোয়াড়দের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের লড়াই করার মানসিকতা। ম্যাচের শেষ মিনিট পর্যন্ত তারা বিশ্বাস ধরে রাখে।

আমার ধারণা, মিসর খুব বেশি বলদখলে রাখার চেষ্টা করবে না। তারা নিজেদের রক্ষণ সুসংগঠিত রেখে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনা করবে। আর্জেন্টিনা যদি অতিরিক্ত খেলোয়াড় নিয়ে সামনে উঠে যায়, তাহলে সেই ফাঁকা জায়গা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে মিসর। তাই আর্জেন্টিনার ফুলব্যাকদের আক্রমণে ওঠার সময় সতর্ক থাকতে হবে।

এই ম্যাচে মাঝমাঠের লড়াইটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে। যে দল মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই দল ম্যাচের গতিও নিয়ন্ত্রণ করবে। আর্জেন্টিনা যদি ছোট ছোট পাসে নিজেদের ছন্দ ধরে রাখতে পারে, তাহলে মিসরকে অনেক দৌড়াতে হবে। আর মিসর যদি মাঝমাঠে চাপ সৃষ্টি করে বল ছিনিয়ে নিতে পারে, তাহলে ম্যাচের চিত্র মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে।

নকআউট ম্যাচে সেট-পিসের গুরুত্বও অনেক। কর্নার, ফ্রি-কিক কিংবা লম্বা থ্রো থেকে গোল হওয়ার সম্ভাবনা সব সময় থাকে। এমন ম্যাচে অনেক সময় ওপেন প্লেতে নয়, বরং একটি স্থির বলই পার্থক্য গড়ে দেয়। তাই দুই দলের রক্ষণভাগকে প্রতিটি মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখতে হবে।

একজন সাবেক ফুটবলার হিসেবে আমি সব সময় একটি বিষয় বিশ্বাস করি, বিশ্বকাপের বড় ম্যাচে কারিগরি দক্ষতার চেয়ে মানসিক দৃঢ়তা অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চাপের মধ্যে কে শান্ত থাকতে পারে, কে ভুল কম করে এবং কে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের পরিকল্পনায় অটল থাকে, সেটিই জয়-পরাজয়ের পার্থক্য গড়ে দেয়।

দুই কোচের কৌশলও এই ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড়দের ব্যবহার, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল বদলানোর সিদ্ধান্তই অনেক সময় ফল নির্ধারণ করে। আধুনিক ফুটবলে বেঞ্চের শক্তিও শুরুর একাদশের মতোই মূল্যবান। আমার বিশ্বাস, আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইবে। অন্যদিকে মিসর অপেক্ষা করবে সঠিক সময়ের। তারা জানে, পুরো ম্যাচে হয়তো দুই বা তিনটি পরিষ্কার সুযোগই আসবে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেই ইতিহাস লেখা সম্ভব।

ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই, ফেভারিট দল সব সময় জেতে না, আবার ছোট দলও ভয় পায় না। তাই আর্জেন্টিনা ও মিসরের এ কোয়ার্টার ফাইনাল শুধু সেমিফাইনালে ওঠার লড়াই নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, কৌশল, সাহস এবং বিশ্বাসেরও পরীক্ষা। যে দল চাপকে নিজের শক্তিতে পরিণত করতে পারবে, শেষ বাঁশি বাজার পর বিজয়ের হাসিটাও তারাই হাসবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত