তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় শুরু হওয়া উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনেই মিত্র দেশগুলোর ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যৌথ প্রতিরক্ষা জোটের এই শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উত্তেজনা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ন্যাটোর ওপর তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট ও হতাশ।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ ন্যাটোর অন্যান্য বিশ্ব নেতারা আঙ্কারায় এসে পৌঁছান। সম্মেলনের মূল ও প্রধান অধিবেশনটি বুধবার (৮ জুলাই) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ৭৭ বছরের পুরোনো এই সামরিক জোটের জন্য বর্তমান সময়টিকে বেশ নাজুক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান, গ্রিনল্যান্ড এবং অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সুরক্ষায় ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ট্রাম্পের ক্রমাগত শঙ্কা ও বিরোধপূর্ণ অবস্থানের কারণে জোটের মধ্যে এক ধরনের ফাটল তৈরি হয়েছে।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ন্যাটো মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এই সম্মেলনটি যদি তুরস্কে অনুষ্ঠিত না হতো, যেখানে আমার একজন অত্যন্ত শক্তিশালী নেতা ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের বন্ধু রয়েছেন, তবে হয়তো আমি এই সম্মেলনে অংশই নিতাম না।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে যেসব ইউরোপীয় দেশ ওয়াশিংটনকে সমর্থন দেয়নি, সংবাদ সম্মেলনে তাদের নাম ধরে সমালোচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, আমরা ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার পর আমাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা হয়নি। যখন তারা বিপদে আমাদের পাশে থাকে না, তখন আমরা কেন তাদের জন্য শত শত কোটি ডলার খরচ করব? আমরা তো সবসময় তাদের পাশে থেকেছি। কিন্তু ইতালি আমাদের প্রত্যাখ্যান করেছে, জার্মানি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ফ্রান্সও আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে।
তবে আঙ্কারার প্রতি বেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চমৎকার বোঝাপড়া বা ‘কেমিস্ট্রি’র কথা উল্লেখ করে তিনি দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে তুরস্কের কাছে বহুল আলোচিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। ট্রাম্প বলেন, তুরস্কের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার।
এবারের ন্যাটো সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি করা। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত চাপের মুখেই মিত্র দেশগুলো এই প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে সম্মেলন শুরুর আগে প্রকাশিত ন্যাটোর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে জোটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মোট জিডিপির ৩.৫ শতাংশ মূল প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে মাত্র পাঁচটি দেশ।
গত বছর দ্য হেগে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সদস্য দেশগুলো অস্ত্র ও সৈন্যের মতো মৌলিক প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় আগের ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.৫ শতাংশ করার চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল। এর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা বৃদ্ধির মতো বিস্তৃত প্রতিরক্ষা খাতে আরও ১.৫ শতাংশ ব্যয় করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল দেশগুলো।
আঙ্কারা সম্মেলন শুরুর প্রাক্কালে ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে 'স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট এবং নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা'র দাবি জানান। তবে একই সঙ্গে তিনি এও বলেন যে, এ পর্যন্ত দেশগুলোর নেওয়া উদ্যোগ বেশ আশাব্যঞ্জক। মঙ্গলবার একটি প্রতিরক্ষা শিল্প ফোরামে দেওয়া বক্তৃতায় রুটে রাশিয়া ছাড়াও চীন, উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের কাছ থেকে আসা হুমকির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। এই দেশগুলো এখন একে অপরের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করছে, তাই আমাদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।
বিশ্লেষক আলেকজান্দ্রো হুডিস্টানু আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক মনোভাব আসলে ইউরোপীয় দেশগুলোকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলছে এবং তারা বুঝতে পারছে যে প্রতিরক্ষায় তাদের আরও বেশি খরচ করা প্রয়োজন। যদিও ন্যাটোর উপাত্ত বলছে, অনেক সদস্য দেশ এখনও তাদের জিডিপির মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি খরচ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা উসকে দিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলটি ডেনমার্কের নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। ডেনমার্কের অধীনস্থ এই অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া মার্কিন নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে ট্রাম্প কয়েক মাস ধরে দাবি করে আসছেন, যা কোপেনহেগেনসহ পুরো ইউরোপে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর আঙ্কারায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। তিনি বলেন, আমি আশা করি মিত্র দেশগুলো ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে এবং এটি মেনে নেবে যে গ্রিনল্যান্ড কোনো বিক্রির বস্তু নয়। যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নিতে চায়, এটি সবার জানা। তবে আমি আশা করি সবাই এটিও ভালো করে জানে যে, এমন কিছু কখনোই ঘটবে না। এবারের সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ড বা সুদূর উত্তর অঞ্চলের বিষয়ে আলোচনার কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি।
এদিকে গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুতে এগিদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ কী হবে তা কেবল এই অঞ্চলের মানুষই নির্ধারণ করবে। এটি অতীতেও এমন ছিল এবং ভবিষ্যতেও এমনটাই থাকবে।
কিয়েভে রাশিয়ার সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী ও ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ন্যাটোর কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে ন্যাটো ইউক্রেনকে আরও সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ন্যাটোতে যোগদানের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে জেলেনস্কি মঙ্গলবার ফেসবুকে জানান, তিনি আঙ্কারায় বসে ইতিমধ্যে এস্তোনিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং ডেনমার্কের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তির ফলে যৌথ অস্ত্র উৎপাদন, আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বিকাশ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে প্রমাণিত ইউক্রেনীয় প্রযুক্তির রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া জার্মানি, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড এবং কানাডার সঙ্গেও শিগগিরই একই ধরনের চুক্তি হতে যাচ্ছে।
নরওয়ে জানিয়েছে, তারা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা এবং বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য ৩০০ কোটিরও বেশি নরওয়েজিয়ান ক্রোন (৩০ কোটি ৬২ লাখ ডলার) প্রদান করবে। অন্যদিকে ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও কানাডা ২০২৬ এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত ইউক্রেনে সামরিক সহায়তার ধারা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করবে বলে জানা গেছে।
ন্যাটো সম্মেলনের আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, আমি আশা করি এই যুদ্ধের দ্রুত সমাধান হবে। আমার মনে হয় দুই পক্ষই একটি চুক্তিতে আসতে চায়। এই প্রক্রিয়াটি অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে, তবে আমি বিশ্বাস করি খুব শিগগিরই ভালো কিছু সামনে আসবে।
সূত্র: আল-জাজিরা