‘ব্যাংক লুটেরাদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকদের দেওয়ার দাবি’

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:০১ এএম

ব্যাংক লুটেরা এবং ব্যাংকখেকো মালিকদের কঠোর শাস্তি এবং তাদের সব সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি রেহানা আক্তার রানু। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে তিনি এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। নোটিসে রেহানা আক্তার রানু বলেন, ‘কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম দুর্নীতি এবং মালিকপক্ষের অর্থ পাচারের কারণে লাখ লাখ আমানতকারী নিজেদের টাকা তুলতে পারছে না।’ জাতীয় সংসদে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘ব্যাংক মানুষের আস্থার জায়গা, সেই ব্যাংক থেকে টাকা লুট হলে মানুষ কোথায় যাবে?’ তিনি বলেন, ‘মানুষ যদি ব্যাংকে টাকা না রাখে বিনিয়োগ কমে যাবে, অর্থের প্রবাহ থেমে যাবে, দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়বে।’

নোটিসে তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংকে একজন মানুষের টাকা আছে কিন্তু টাকা তুলতে পারছেন না বলে তিনি চিকিৎসা করাতে পারছেন না। টাকার অভাবে সময়মতো চিকিৎসা না করাতে পেরে অনেকে মৃত্যুবরণ করছেন। এই মানুষগুলো বর্তমান সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। অন্যদিকে লুটেরা মালিকপক্ষ বিদেশে পালিয়ে আরামে জীবনযাপন করছে।’ তিনি লুটেরা এবং ব্যাংকখেকো মালিকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে তাদের সব সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা গ্রাহকের হাতে ফিরিয়ে দিতে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

নোটিসের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “সরকার দেশের অর্থনীতির মেরুদ- আর্থিক খাত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে একটি সুসংগঠিত বহুমাত্রিক রেজল্যুশন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কাঠামোর আইনি ভিত্তি হিসেবে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ বর্ণিত হয়েছে। এর আওতায় সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংককে (এক্সিম ব্যাংক পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ও ইউনিয়ন ব্যাংক) একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে।” অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই একীভূতকরণের ফলে পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানতকারীর দাবি ও স্বার্থ নতুন ব্যাংকে সংরক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি আমানত সুরক্ষা তহবিল বিধানের আওতায় নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত আমানতকারীর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ রেজল্যুশনের আওতায় ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজল্যুশন স্কিম মোতাবেক আমানতের অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত পাচ্ছেন বলেও জাতীয় সংসদকে জানান অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর আমানতকারীরা ইতিপূর্বে আমানত সুরক্ষা আইনের আওতাভুক্ত ছিল না। বর্তমান সরকার তাদেরকেও অর্ন্তভুক্ত করেছে। এই সব পদক্ষেপের মাধ্যমে গ্রাহকদের আমানতপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি এই পাঁচটি ব্যাংকে অনিয়মের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলমান রয়েছে। যার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে সম্পদ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর রেহানা আক্তার রানু বলেন, ‘মন্ত্রীর চট্টগ্রামের বাসার সামনে গ্রাহকরা মানববন্ধন করেছেন এবং মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাদের আকুতি জানিয়েছেন।’ তিনি ৭৫ লাখ গ্রাহকের প্রাণের দাবির সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বলেন, একদিকে মানুষ টাকা তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে, অন্যদিকে যোগ হয়েছে ‘হেয়ারকাট’ নামক এক ‘মরণকাট’ সমস্যা। তিনি বলেন, ‘আমি অর্থমন্ত্রীকে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করতে চাই, আমি জানতে চাই যে, ব্যাংক ডাকাতদের ডাকাতির দায়ভার কেন আমানতকারীদের নিতে হবে? আমানতকারীদের কী অপরাধ? এ সময় গ্রাহকদের দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করে রেহানা আক্তার রানু অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, আমার প্রশ্ন ‘হেয়ারকাট’ নামক ‘মরণকাট’ প্রত্যাহার করে ৭৫ লাখ গ্রাহককে স্বস্তি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপনার মন্ত্রণালয়ের আছে কি না?

জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এ সমস্যার সঠিক সমাধান দেওয়া একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব। সংসদে আমি আগেও বলেছি, যারা আমানতকারী তাদের আমানত সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ। তবে একটু ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ এই ব্যাংকগুলোর সবই লোকসানের মধ্যে আছে এবং লোকসান প্রতিদিনই বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে নিশ্চিতভাবে তাদের আমানত সুদসমেত ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু এটার জন্য একটা সময়ের প্রয়োজন।’

ব্যাংকগুলোতে ‘হেয়ারকাট’ থাকবে না উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি গ্রাহকদের অপেক্ষার সময় নেই। মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছেন। মানুষ তার মেয়ের বিয়ে দিতে পারছেন না। প্রতিনিয়ত এই সব সমস্যার সঙ্গে সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত পাবেন, সুদসহ ফেরত পাবেন। তবে একটু ধৈর্য ধারণ করতে হবে।’

গ্রামে গেলে বিদ্যুৎ ইস্যু বিব্রত করে : জাতীয় সংসদে গ্রামে-গঞ্জে বিদ্যুৎ এখন বড় ইস্যু উল্লেখ করে জামালপুর-৩ আসনের সরকারদলীয় এমপি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল সম্পুরক প্রশ্নে বলেন, ‘আমরা যখন গ্রামে যাই, এই ইস্যু আমাদের বিব্রত করে, অস্বস্তিতে ফেলে।’

তিনি বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকা মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ এই দুই উপজেলায় পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ৪৩ মেগাওয়াট, বর্তমানে প্রাপ্তি ২৭ মেগাওয়াট। অফ-পিক আওয়ারে চাহিদা ৩৮ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ করা হয় ২৫ মেগাওয়াট। ফলে গড়ে ৩৪-৩৮ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে কবে নাগাদ উত্তরণ সম্ভব এবং কবে নাগাদ গ্রাহকদের আশ^স্ত করতে পারব, লোডশেডিংয়ের হাত থেকে পরিত্রাণ দিতে পারব?’

জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘ময়মনসিংহ এলাকায় ট্রান্সমিশন লাইনে সমস্যা রয়েছে। এ জন্য আমরা ট্রান্সমিশন লাইনের প্রকল্প গ্রহণ করেছি। ট্রান্সমিশনের জন্য বড় বড় টাওয়ার করতে হয়। কিন্তু জমির মালিকরা মামলা করে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে। এ জন্য এতদিন ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপন করা যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘জয়দেবপুর-শম্ভুগঞ্জের লাইনের জন্য ভালুকায় এক জমির মালিকের মামলা অনেক দিন পরিচালনার পর সরকার বিজয়ী হয়েছে। কিন্তু তারপরও কাজ করতে পারছি না। গতকাল ভালুকার এমপির সঙ্গে বসেছি। আশা করি, এমপির সহযোগিতায় আমরা আবার কাজ শুরু করতে পারব। এই লাইন নির্মিত হলে আশা করি ওই এলাকার বিদ্যুৎসংকট অনেকখানি কমে যাবে।’

খাসজমি উদ্ধার ও ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ : সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন মনোযোগ আকর্ষণ নোটিসের জবাবে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু গতকাল জাতীয় সংসদে বলেন, ‘সরকারি খাসজমি অবৈধ দখলমুক্ত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ তিনি বলেন, ‘ভূমিদস্যুমুক্ত সরকারি খাসজমি নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত ভূমিহীন মানুষের মধ্যে এসব জমি বিতরণে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যেই সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে খাসজমি উদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।’

জাতীয় সংসদকে ভূমিমন্ত্রী আরও জানান, ‘দীর্ঘদিন ধরে কোনো এলাকায় বসবাসরত দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে প্রতিটি পরিবারকে এক থেকে দুই কাঠা পর্যন্ত জমি দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে খাসজমি উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি খাসজমি উদ্ধার এবং প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।’

সরকারি হিসাবসম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরকারি হিসাবসম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি মনোনীত হয়েছেন কুমিল্লা-১১ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। গতকাল জাতীয় সংসদে সংসদ নেতার পক্ষে চিফ হুইপ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আমান উল্লাহ আমান (ঢাকা-২), এ বি এম আশরাফউদ্দিন নিজান (লক্ষ্মীপুর-৪), এ কে এম ফজলুল হক মিলন (গাজীপুর-৫), মোহাম্মদ হাফিজ ইব্রাহিম (ভোলা-২), এ এম মাহবুবউদ্দিন (নোয়াখালী-১), মোহাম্মদ জালালউদ্দিন (চাঁদপুর-২), ড. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান (ময়মনসিংহ-৭), এস কে আজিজুল বারি হেলাল (খুলনা-৪), মো. মনজুরুল ইসলাম (দিনাজপুর-১), মোহাম্মদ ফজলে হুদা (নওগাঁ-৩), মোহাম্মদ জাকির হোসেন (ময়মনসিংহ-৫), সৈয়দ জয়নুল আবেদিন (ঢাকা-৪), মোহাম্মদ রুহুল আমিন (চুয়াডাঙ্গা-২) এবং মোহাম্মদ আনারুল ইসলাম (কুড়িগ্রাম-১)।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত