টানা অতিভারী বর্ষণে দ্বিতীয় দিনের মতো জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট জলাবদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও পানি জমে গেছে। এতে করে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। বর্ষণের জেরে পৃথক দুটি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে মাটিচাপা পড়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন এক শিশুর মাও। অন্যদিকে বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন জায়গায় রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তলিয়ে যাওয়া রেললাইন পরিদর্শন করে আরও পাঁচ ফুট উঁচু করা হবে বলে জানিয়েছেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ।
পাহাড়ধসে ২ শিশুর মৃত্যু, আহত ১ : গতকাল বুধবার সকালে সীতাকু- উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর ও দুপুরে নগরীর চশমা হিলে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত দুদিনে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে চারজনের মৃত্যু হলো। স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৯টার দিকে সীতাকু-ের জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ির ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। এতে মঈন উদ্দিনের ১০ মাস বয়সী শিশুসন্তান আশরাফুল ইসলাম তানভীর মাটির নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এ সময় তার মা লামিয়া আক্তারও মাটির নিচে আটকা পড়েন। পরে প্রতিবেশীরা দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
অন্যদিকে দুপুরের দিকে চট্টগ্রাম নগরীর চশমা হিলের ২ নম্বর গলির বাবু কলোনিতে আরেকটি পাহাড়ধসের
ঘটনা ঘটে। সেখানে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে সামিয়া নামে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরী নিখোঁজ হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের বায়েজিদ বোস্তামী স্টেশনের একটি উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে কিশোরীর মরদেহ মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়।
পানির নিচে রেললাইন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ : অতিভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন জায়গায় রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় পর্যটননগরী কক্সবাজারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল বুধবার সকাল থেকে এ রুটে সব ধরনের ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী নিয়মিত চার জোড়া ট্রেনের হাজার হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিকী জানান, রেললাইনের ওপর পানি উঠে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পানি নেমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই রুটে ট্রেন চলাচল শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
ডুবে থাকা রেললাইন উঁচু করা হবে ৫ ফুট রেল প্রতিমন্ত্রী : এদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ডুবে থাকা রেললাইন পরিদর্শন করেছেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। এ সময় তিনি ডুবে থাকা রেললাইন ৫ ফুট উঁচু করা হবে বলে জানান। গতকাল সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে রেলওয়ের ট্র্যাক পরিদর্শন ও মেরামতের মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত একটি গ্যাংকারে ডুবে থাকা রেললাইন পরিদর্শনে বের হন। পরে নগরীর ষোলোশহর শমসেরপাড়া এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে এই লাইনটি আরও ৫ ফুট উঁচু করা হবে। চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার রেললাইনে কাজ হবে। ইতিমধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
যাত্রীদের জন্য রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখার ইচ্ছার কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৃষ্টিতে লাইনে যে পরিমাণ পানি জমেছে, তাতে রেল চলাচল করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ বন্ধ রেখেছি।
পাহাড় কাটায় জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবি চসিক মেয়রের: অতীতে যারা অবৈধভাবে পাহাড় কেটে নগরে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাদের দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। গতকাল চশমাহিলে পাহাড়ধসের স্থান পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মেয়র এসব কথা বলেন।
মেয়র বলেন, এখানে এসে দেখেছি, পাহাড় কাটা হয়েছে। পাহাড়টি স্বাভাবিকভাবে থাকার কথা থাকলেও সেটি কেটে প্রায় খাঁড়া করে ফেলা হয়েছে। এর ফলে পুরো এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে যারা পাহাড় কেটেছে এবং যারা এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।