ফাইনালের আগে ফাইনাল

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:১২ এএম

ফুটবলবিশ্বযখন লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা আর্লিং হালান্ডের মতো মহাতারকার দ্যুতিতে বুঁদ হয়ে আছে, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ নতুন এক ফুটবলীয় দর্শনে ২০২৬ বিশ্বকাপের ট্রফির দিকে চোখ রাঙাচ্ছে স্পেন। ২০১০ সালের সেই নান্দনিক ‘টিকিটাকা’র নস্টালজিয়া ঝেড়ে ফেলে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা এখন খেলছেন এক নির্মম, গতিময় ও নিখুঁত কার্যকর ফুটবল। আর এই নতুন রণকৌশলে ভর করেই সেমিফাইনালে বিশ^চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে তারা; যাকে ফুটবলবোদ্ধারা অভিহিত করছেন ‘ফাইনালের আগে ফাইনাল’ হিসেবে।

এক সময় স্প্যানিশ ফুটবল মানেই ছিল বলদখলের লড়াই, শত-সহস্র পাসের জ্যামিতিক নিখুঁত বুনন যার নাম ছিল ‘টিকিটাকা’। তবে সময়ের বিবর্তনে প্রতিপক্ষ যখন এই কৌশলের প্রতিষেধক খুঁজে পায়, তখন এটিই স্পেনের জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠেছিল। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ডুবতে থাকা টাইটানিকের ব্যান্ডের মতো পাস খেলতে খেলতেই বিদায় নিয়েছিল তারা। তবে বর্তমান স্প্যানিশ দলটি পাসের পাহাড় না গড়ে বিশ্বাসী ভারসাম্য, প্রতিনিয়ত প্রেসিং এবং প্রতিপক্ষের ভুলের মোক্ষম সুযোগটি কাজে লাগিয়ে চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় আঘাত করার দক্ষতায়।

লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই ‘নতুন মেশিন’ কতটা ভয়ংকর, তার প্রমাণ মিলেছে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে। ম্যাচের ৮৫তম মিনিটে মাঠে নেমে মাত্র দুই মিনিটের মাথায় (৮৭তম মিনিটে) জয়সূচক গোলটি করেন মিকেল মেরিনো। শেষ ষোলোতে পর্তুগালের বিপক্ষেও ঠিক একই উপায়ে গোল করেছিলেন তিনি। এবারের বিশ^কাপে খেলা ৬টি ম্যাচের একটিতেও স্পেন কখনো পিছিয়ে পড়েনি, প্রয়োজন হয়নি কোনো অতিরিক্ত সময় বা টাইব্রেকারের। এমনকি পুরো টুর্নামেন্টে তারা গোল হজম করেছে মাত্র একটি।

কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে বিদায় করার পর স্পেনের বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালের কণ্ঠে ঝরেছে প্রবল আত্মবিশ্বাস। প্রতিপক্ষ দলগুলোর রক্ষণাত্মক কৌশলকে এক হাত নিয়ে ইয়ামাল বলেন, “এই টুর্নামেন্টে কোনো দলই আমাদের সঙ্গে সমানে সমানে লড়াই করার সাহস দেখাচ্ছে না। সবাই আমাদের বিরুদ্ধে রক্ষণাত্মক ‘বাস পার্ক’ কৌশল বেছে নিচ্ছে।”

বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১৮ বছরেই একজন পরিপক্ব ফুটবলারের মতো দায়িত্ব পালন করেছেন ইয়ামাল। তার খেলা ছিল নিরবচ্ছিন্ন এবং গোছানো। ডোকু এবং দে কুইপারের আক্রমণ রুখতে তিনি নিচে নেমে পোরোকে সাহায্য করেছেন, যারা এই টুর্নামেন্টে স্পেনের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে বিপজ্জনক উইং জুটি ছিল। মাঝ মাঠে যখনই তার প্রয়োজন হয়েছে, তিনি বিচক্ষণতা ও উদারতার সঙ্গে খেলেছেন। বক্সের কাছাকাছি জায়গায় তিনি ছিলেন অক্লান্ত এবং কখন ঝুঁকি নিতে হবে তা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কোনো বল অযথা নষ্ট করেননি এবং পোরোকে পাস দিয়েই ১-০ গোলের আক্রমণের সূচনা করেছিলেন।

সেমিফাইনালে অল-পাওয়ারফুল ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফরাসি শিবিরকে প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিয়ে এই তরুণ উইঙ্গার আরও বলেন, ‘ফ্রান্স যদি চলতি বিশ্বকাপে কোনো দলকে ভয় পেয়ে থাকে, তবে সেই দলটির নাম স্পেন।’ ইয়ামালের এই মন্তব্যকে অনেকে অহংকার মনে করলেও, তা মূলত স্পেনের বর্তমান ফর্মেরই বাস্তব প্রতিফলন।

স্পেনের ঐতিহ্যবাহী সান ফারমিনের ষাঁড়ের দৌড়ের মতো করেই যেন খেলছে এই দল। যেখানে অতি-সতর্ক হয়ে রক্ষণ আগলে রাখা নয়, বরং প্রতিপক্ষের সীমানায় সঠিক সময়ে সঠিক সুযোগটি চিনে নেওয়ার ক্ষিপ্রতাই মূল চাবিকাঠি।

কাগজে-কলমে এটি সেমিফাইনাল হলেও, টুর্নামেন্টের সেরা দুই দলের এই দ্বৈরথ মূলত রূপ নিয়েছে অঘোষিত ফাইনালে। একদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সের একক আধিপত্য, অন্যদিকে নতুন কৌশলে অপ্রতিরোধ্য স্পেনের দলীয় শক্তি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত