ভোরের নীরবতা ভেঙে এক সময় নাটোরের বাগাতিপাড়ার বিভিন্ন গ্রামে ভেসে আসত হাতুড়ি-বাটালের খটখট শব্দ। সেই শব্দই কাঠের চাকা তৈরির কারখানাগুলোর ব্যস্ততার জানান দিত। সময়ের পরিবর্তন, যান্ত্রিক যানবাহনের বিস্তার ও চাহিদা কমে যাওয়ায় সেই শব্দ এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। এই উপজেলার ৩০টি কাঠের চাকা তৈরির কারখানার মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র একটি। আর সেই কারখানায় একাই কাজ করছেন বিশ্বরূপ সূত্রধর নামের এক কারিগর।
বাগাতিপাড়া উপজেলার বাটিকামারি গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বরূপ সূত্রধরের বয়স এখন ৬৮ বছর। ১৫ বছর বয়সে তিনি এই পেশায় জড়ান। তিনি এক সময় উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে চাকা বানাতেন। ৩৮ বছর হলো তিনি দয়ারামপুর ইউনিয়নের নন্দীকুজা গ্রামের উত্তম কুমার রায়ের কারখানায় কাজ করছেন।
এক সময় বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর, তমালতলা, চকগোয়াস, মালঞ্চি, বাটিকামারি ও নন্দীকুজা এলাকায় অন্তত ৩০টি কাঠের চাকা তৈরির কারখানা ছিল। প্রতিটি কারখানায় তিন থেকে পাঁচজন কারিগর কাজ করতেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে গরুর গাড়ির কাঠের চাকা কিনে নিয়ে যেতেন। কিন্তু যান্ত্রিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঠের চাকার চাহিদা কমতে থাকে। ফলে একে একে বন্ধ হতে থাকে প্রায় সব কারখানা। বর্তমানে নন্দীকুজার উত্তম কুমার রায়ের কারখানাটিই এই ঐতিহ্যের শেষ সাক্ষী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরনো সেই কারখানায় ভারী হাতুড়ি-বাটালের আঘাতে বাবলা কাঠে ছিদ্র করছেন বিশ্বরূপ সূত্রধর। প্রায় ২ কেজি ওজনের হাতুড়ি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করে একটি চাকা তৈরি করতে তার সময় লাগে তিন দিন।
বিশ্বরূপ সূত্রধর জানালেন, ‘ছোট বয়সে যখন এই কাজ শুরু করি তখন আমার মজুরি ছিল ১০ টাকা, আর এক জোড়া কাঠের চাকার দাম ছিল তখন ৬০ টাকা। এখন প্রতিদিন কাজ করে তিনশ টাকা পাই। আর একটি চাকার দাম প্রায় ৬ হাজার টাকা। কাজটা খুবই কষ্টের। সারা দিন ভারী হাতুড়ি-বাটাল দিয়ে কাজ করতে হয়। এই কাজ ছাড়া আর কিছু শিখিনি। তাই শরীর যতদিন চলবে, ততদিন এই পেশা ছাড়তে চাই না।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এক সময় আমার সঙ্গে অনেক কারিগর কাজ করতেন। তাদের প্রায়ই বেশির ভাগই আজ আর বেঁচে নেই। নতুন প্রজন্মের কেউ আর এই পেশায় আসতে চায় না। তাই আমার পর এই কাজ টিকবে কি না, জানি না।’
কারখানার মালিক উত্তম কুমার রায় বলেন, ‘এটি আমাদের বাপ-দাদার পেশা। তাই এখনো ধরে রেখেছি। কয়েক বছর আগেও এই কারখানায় চার-পাঁচজন কারিগর কাজ করতেন। এখন শুধু বিশ্বরূপ আছেন। তিনি কাজ ছেড়ে দিলে বাগাতিপাড়ার কাঠের চাকা তৈরির যে শত বছরের ঐতিহ্যতার অবসান ঘটবে।
উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের চকগোয়াস এলাকার প্রবীণ কারিগর বীরেন্দ্রনাথ জানান, তিনি টানা ৫৬ বছর কাঠের চাকা তৈরির কাজ করেছেন। কিন্তু কম মজুরি ও কাজের সংকটের কারণে ৯ বছর আগে এই পেশা ছেড়ে ফার্নিচারের কাজে যোগ দিয়েছেন।
বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ বসাক বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প সংরক্ষণ ও বিকাশে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ^রূপ সূত্রধরের মতো দক্ষ কারিগরদের পাশে থেকে তাদের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন কাজ করে যাবে।