ফুটবল মাঠে কখনো কখনো যুক্তি আর পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় নিয়তি। লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঠে শুক্রবার রাতে যা ঘটল, তা কেবল একটি কোয়ার্টার ফাইনাল ছিল না; ছিল স্নায়ুর চরম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার এক লড়াই। ম্যাচের ৮৬ মিনিট পর্যন্ত স্কোরলাইন ছিল ১-১ সমতায়। স্পেনের অজেয় রক্ষণভাগ ভেঙে বেলজিয়ামের সমতায় ফেরা এবং চোটে গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়ার চোখের পানি বিদায় সব মিলিয়ে ম্যাচের প্রতিটি পরতে পরতে ছিল নাটকীয়তা। কিন্তু গল্পের শেষটা আবারও হয়ে থাকল সেই এক পরিচিত স্ক্রিপ্টেই। বেঞ্চ থেকে উঠে আসা এক অখ্যাত নায়কের গোল, যা স্পেনকে পৌঁছে দিল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।
এই অবিশ্বাস্য ঘটনার নায়ক মিকেল মারিনো এখন যেন বর্তমান স্পেনের ফুটবলের ‘লাকি চার্ম’। কেবল এ ম্যাচেই নয়, পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচেও তিনি একইভাবে দলের ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেদিন ৮৪ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে ৯১ মিনিটে গোল করে দলকে জিতিয়েছিলেন তিনি। এবার বেলজিয়ামের বিপক্ষেও ঘটল সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি। ৮৬ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র দুই মিনিটের মাথায় (৮৮ মিনিটে) গোল করে আবারও স্পেনকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিলেন মারিনো। বিশ্বকাপের ইতিহাসে একই আসরে দুটি নকআউট ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে গোল করে দলকে জেতানোর এমন রেকর্ড আর কারও নেই। ম্যাচশেষে স্পেনের জয়সূচক গোলদাতা মারিনো এবার বিশ্বজয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেন, ‘আমরা বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে আর মাত্র দুই ধাপ দূরে আছি এবং সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
ম্যাচ শুরুর আগে লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশল ছিল বেশ সাহসী। পেদ্রিকে বেঞ্চে বসিয়ে ফ্যাবিয়ান রুইজকে মাঠে নামিয়ে তিনি পুরো মিডফিল্ডের মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন। ৩০ মিনিটে সেই সিদ্ধান্তের প্রথম সুফল পায় স্পেন। দানি অলমোর জোরালো শট কোর্তোয়া ফিরিয়ে দিলেও ফিরতি বলে রুইজের লক্ষ্যভেদী শট স্পেনকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়। গ্যালারিতে উপস্থিত পেনেলে ক্রুজ, জাভিয়ার বারদেম কিংবা ব্র্যাড পিটদের মতো তারকাদের মুখে তখন
তৃপ্তির হাসি। মনে হচ্ছিল, স্পেন আবার তাদের সেই ২০১০ সালের সোনালি দিনের ছন্দে ফিরছে।
কিন্তু বেলজিয়ামের ‘সোনালি প্রজন্ম’ তখনো শেষবারের মতো লড়তে প্রস্তুত। প্রথমার্ধের ঠিক আগে ৪১ মিনিটে কেভিন ডি ব্রুইনার এক জাদুকরী পাস স্পেনীয় রক্ষণভাগের সব হিসাব এলোমেলো করে দিল। টিমোথি কাস্তানের নিখুঁত ক্রস থেকে চার্লস ডি কেটেলিয়ারে হেডে গোল করে বেলজিয়ামকে ম্যাচে ফেরালেন। এ গোলের মাধ্যমে স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন বিশ্বকাপের টানা ৬৫০ মিনিটের যে অভেদ্য দেওয়াল গড়েছিলেন, তার পতন ঘটল। স্পেনের জন্য এটি ছিল এবারের বিশ্বকাপে প্রথম গোল হজম।
এদিকে বেলজিয়ামের জন্য এই ম্যাচটি ছিল ইনজুরির অভিশাপের মতো। আমাদু ওনানা আগেই মাঠের বাইরে ছিলেন। তার ওপর ম্যাচের ঠিক আগে অধিনায়ক ইউরি তিলেমানস ইনজুরিতে পড়ায় দলটির মেরুদণ্ড যেন ভেঙে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটি ঘটে ৭১ মিনিটে। থিবো কোর্তোয়া, যিনি ম্যাচে চারটি অবিশ্বাস্য সেভ করেছিলেন, তিনি পায়ের পেশির চোটে যখন কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন পুরো স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ছিল এক পিনপতন নীরবতা। গোলরক্ষকের এই কান্না যেন বেলজিয়ামের ভাগ্য বিড়ম্বনারই প্রতিফলন ছিল। তার বদলি হিসেবে নামা তরুণ সেন ল্যামেন্সের গায়ে হয়তো কোর্তোয়ার অভিজ্ঞতার সেই দীপ্তি ছিল না।
কোর্তোয়ার মাঠছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি নিজেই জানান, ‘আমি খেলা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কোচের সিদ্ধান্ত ছিল এমন একজনকে নামানো যে ১০০ শতাংশ ফিট। আমি তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি এবং এতে কোনো সমস্যা নেই।’
কোর্তোয়ার জায়গায় নামা তরুণ সেন ল্যামেন্সের কাঁধে ছিল অনেক বড় দায়িত্ব। খেলার শেষ পাঁচ মিনিটে যখন ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছিল, তখনই ঘটে বিপর্যয়। পাউ কুবার্সির একটি সাধারণ নিচু শট ল্যামেন্স হাত থেকে ফসকে দিলেন। গোলপোস্টের বাইরে থেকে অসহায় কোর্তোয়াকে স্রেফ তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। ম্যাচশেষে ল্যামেন্সের মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করে কোর্তোয়া বলেন, ‘আমি সেনকে বড় একটি আলিঙ্গন দিয়েছি। এ মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু করার নেই। আমি জানি, একজন গোলরক্ষকের জন্য এটি কতটা বাজে অনুভূতি। তবে ও দারুণ একজন গোলরক্ষক এবং এ ঘটনা থেকে ও আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরবে।’
ল্যামেন্স যদি পাউ কুবার্সির সেই নিচু শটটি হাত থেকে ফসকে না দিতেন, হয়তো ম্যাচটি টাইব্রেকারের দিকেই ধাবিত হতো। কিন্তু ল্যামেন্সের সেই ভুলে বক্সের ভেতর শিকারির মতো ওত পেতে থাকা মারিনো কোনো ভুল করেননি। বল জালে জড়িয়ে তিনি যখন কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে দৌড় দিলেন, তখন স্পেনের জয়ের উৎসবে মেতে ওঠা হাজারো দর্শকের চিৎকার পুরো লস অ্যাঞ্জেলেসে শহরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
নিজের দুই মাস বয়সী সন্তান মার্কোকে উৎসর্গ করা এ গোলটি মারিনোর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। ইউরো ২০২৪-এর কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে এবং বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে পর্তুগালের বিপক্ষেও তার গোলগুলো স্পেনকে বাঁচিয়েছিল। তবে ম্যাচশেষে দে লা ফুয়েন্তে বিনীত কণ্ঠে বলেন, ‘এটি দলের জয়, কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের নয়। মারিনো শুধু শেষ কাজটি সম্পন্ন করেছে।’
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে স্প্যানিশ কোচ ফুয়েন্তে বলেন, ‘ফ্রান্সের বর্তমান দলটিকে আমরা জানি, তারা প্রতিটি বিভাগেই ভারসাম্যপূর্ণ এবং তাদের ব্যক্তিগত দক্ষতা অসাধারণ। তবে আমরা আমাদের নিজস্ব দর্শনে অটল থাকব। বেলজিয়ামের বাধা পেরিয়ে আমাদের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে, ফ্রান্সের বিপক্ষেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই আমাদের লক্ষ্য।’ ডালাসের মাঠেই হয়তো সেই চূড়ান্ত উত্তরটি পাওয়া যাবে। আপাতত বেলজিয়ামের জন্য এ রাতটি ছিল এক সোনালি স্বপ্নের করুণ সমাপ্তি।