এমবোলোর লাল কার্ড ও ভিএআর

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

উত্তর আমেরিকায় ফুটবল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের ১১ জুলাই দিনটি ইতিহাসে লেখা থাকবে মাঠের ফুটবলের চেয়ে প্রযুক্তির হস্তক্ষেপের এক চরম সাক্ষী হিসেবে। কানসাস সিটি থেকে মায়ামি, উত্তাপ ছড়ানো দুটি ম্যাচেই রেফারির সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর-এর ভূমিকা নিয়ে। একদিকে ফিফার নতুন প্রবর্তিত ‘ভুল পরিচয় সংশোধন’ আইনের গ্যাঁড়াকলে সুইজারল্যান্ড, অন্যদিকে স্টেডিয়ামের স্পাইডারক্যামের তারে বল লাগার বিতর্কিত অভিযোগ তুলেছে নরওয়ে। প্রযুক্তির এই অতি-ব্যবহার, বিচারিক অসামঞ্জস্য এবং মাঠের ফুটবলের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হওয়ার বিষয়টি এখন বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে এক গভীর ও উত্তপ্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সুইজারল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ছিল সমানে-সমান। ১-১ সমতায় ম্যাচটি যখন নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ৭২ মিনিটে ঘটে সেই নাটকীয় ও বিতর্কিত ঘটনা। আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যান সুইস স্ট্রাইকার ব্রেল এমবোলো। মাঠের রেফারি জোয়াও পিনহেইরো শুরুতে মনে করেছিলেন পারেদেস ফাউল করেছেন এবং তাকে হলুদ কার্ড দেখান। কিন্তু ভিএআর-এর হস্তক্ষেপ পুরো ম্যাচের দৃশ্যপট বদলে দেয়। ভিডিও রিপ্লেতে দেখা যায়, পারেদেসের শরীরের সঙ্গে কোনো শারীরিক সংস্পর্শ হওয়ার আগেই এমবোলো ডাইভ দিয়েছেন। এই তথ্য পাওয়ার পর রেফারি পারেদেসের হলুদ কার্ড বাতিল করেন এবং নিয়ম অনুযায়ী ডাইভ দেওয়ার অপরাধে এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখান। এটি ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ প্রোটোকলের আওতায় লাল কার্ডের প্রথম নজির।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ফিফার নতুন এই আইনটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। রেফারিদের প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনার বিশেষ অনুরোধে ফিফা এই বিশ্বকাপে কিছু নতুন নিয়ম এনেছে। আগের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ফাউলের ঘটনায় রেফারি কার্ড দেওয়ার পর খেলা শুরু হয়ে গেলে বা ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দিলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকত না। কিন্তু নতুন নিয়মে, যদি রেফারি সম্পূর্ণ বিপরীত দলের কাউকে ভুল করে কার্ড দেন, তবে ভিএআর মনিটর দেখে মূল অপরাধীকে শনাক্ত করে কার্ড দেওয়া যাবে। টুর্নামেন্টের শুরুতে নেদারল্যান্ডস বনাম যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচেও এই নিয়মের আংশিক ব্যবহার দেখা গিয়েছিল। অর্থাৎ, ভুল পরিচয় সংশোধন বা ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ প্রোটোকল মেনে রেফারির মূল ভুল সংশোধনের ক্ষমতা এখন অনেক বেশি বিস্তৃত।

এদিকে ম্যাচ শেষে এটি নিয়ে সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিন তার ক্ষোভ কোনোভাবেই আড়াল করতে পারেননি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সিদ্ধান্তকে ‘ফুটবল ধ্বংসকারী’ বলে অভিহিত করে বলেন, ‘আমাদের এমন একটি নিয়মের কারণে শাস্তি দেওয়া হয়েছে যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং ফুটবলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। পরিস্থিতিটা ছিল খুবই সাধারণ, রেফারির খেলা চালিয়ে যেতে দেওয়া উচিত ছিল। ভিএআর-এর এই অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ আমাদের পুরো ম্যাচটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে সমতায় ফেরার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই ছিল। আমার ছেলেরা আজ সত্যিকারের হিরো, এভাবে বিদায় নেওয়াটা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।’ সুইস মিডফিল্ডার মিডফিল্ডার রেমো ফ্রয়লারও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ফিফাকে অবশ্যই আমাদের কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে যে কীভাবে ভিএআর এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়।’

অন্যদিকে মায়ামিতে নরওয়ের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ২-১ গোলের জয়েও প্রযুক্তি নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নরওয়ের অভিযোগ, ইংল্যান্ডের গোলের ঠিক আগে তাদের গোলরক্ষক আরিয়ান ন্যালান্ডের নেওয়া গোল কিক আকাশে থাকা স্টেডিয়ামের ওভারহেড স্পাইডারক্যামের তারে আংশিক আঘাত করেছিল। ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী, বল তারে আঘাত করলে খেলা থামিয়ে রেফারিকে ‘ড্রপ বল’ দিতে হয়। নরওয়ে কোচ স্টালে সোলবাকেন মাঠেই রেফারি ক্লেমেন্ট টার্পিনের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘বলটি আকাশ থেকে সোজা নিচে নেমে আসে কারণ এটি তারে স্পর্শ করেছিল, যা আমাদের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। এটা আমাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক একটি মুহূর্ত ছিল।’

ফিফা পরবর্তী সময়ে এক বিবৃতিতে দাবি করে যে, বলের ভেতরে থাকা সেন্সরে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক কম্পন বা ‘হার্টবিট পিক’ ধরা পড়েনি, তাই গোলটি সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু সোলবাকেন ফিফার এই প্রযুক্তিগত দাবির বিপরীতে অনড় অবস্থানে থেকে বলেন, ‘আমি প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্ক করতে চাই না, কিন্তু মাঠের পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম। আমার গোলরক্ষক এবং খেলোয়াড়রা নিশ্চিত যে বল তারে লেগেছে। আমরা রেফারিকে বিষয়টি বুঝিয়েছি, কিন্তু তার কাছে ভিএআর থেকে কোনো সংকেত আসেনি।’

এই ঘটনার পাশাপাশি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ভিএআর রেফারি জেরোম ব্রিসার্ড। এর আগে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচেও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য সমালোচিত হওয়া এই ফরাসি রেফারিকে নিয়ে এখন নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এদিকে ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ প্রোটোকল প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যেও বড় বিভাজন রয়েছে। অনেকে মনে করেন, রেফারিদের সহায়তার জন্য আসা প্রযুক্তি এখন নিজেই রেফারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, যা মাঠের উত্তাপ ও স্বাভাবিক গতি কমিয়ে দিচ্ছে।

আসরে এমন প্রযুক্তিগত বিতর্ক শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং পুরো বিশ্বকাপের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দিনের শেষে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে পা রেখেছে ঠিকই, কিন্তু প্রযুক্তির এই অতি-হস্তক্ষেপ মাঠের ফুটবলের সৌন্দর্য ও আবেগ নিয়ে যে বড় প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছে, তা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক হিসেবে থেকে যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত