মায়ামির অগ্নিপরীক্ষায় বেলিংহামের দাপট

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫১ এএম

‘সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সময়েই যোদ্ধার আসল পরিচয় মেলে’ আর্নেস্ট হেমিংওয়ের এই অমর বাণীর সার্থকতা যেন খুঁজে পাওয়া গেল মায়ামির উত্তপ্ত রাতে। আজতেকার পাতলা বাতাসে যেই জুড বেলিংহাম অবিশ্বাস্য জোড়া গোল করে ইংল্যান্ডকে নকআউট পর্বে পথ দেখিয়েছিলেন, নরওয়ের বিপক্ষে তিনি আরও একবার যেন নতুন করে নিজেকে ছাড়িয়ে গেলেন। একদিকে যখন দলের সতীর্থরা ক্লান্তি আর স্নায়ুচাপে ধুঁকছিল, তখন মাঝমাঠে বেলিংহাম দাঁড়িয়ে রইলেন এক অজেয় স্তম্ভের মতো। ঠিক যেমন ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর সবুজ গালিচায় একাই আর্জেন্টিনাকে কাঁধে নিয়ে শিরোপার মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা, শনিবারের রাতে বেলিংহামের পায়ের কারুকাজও মনে করিয়ে দিল সেই ইতিহাসকেই। নরওয়ের সম্মিলিত আক্রমণ আর মাঠের সব ক্লান্তি যখন থ্রি লায়ন্সদের গ্রাস করতে চেয়েছিল, তখন বেলিংহামের জোড়া গোল শুধু ম্যাচই জেতাল না, বরং ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বজয়ের স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তুলল। ১৯৯০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা ইংল্যান্ডের এই জয়যাত্রায় বেলিংহাম হয়ে উঠলেন দলের একমাত্র আলোকবর্তিকা।

বেলিংহামের কথা বললে এখন যেন আর বয়সের হিসাব চলে না। ফুটবলের আধুনিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে উঠেছেন তিনি। এই বিশ্বকাপে তার পা যেন এক গোলমেশিন, তবে তার কাজের ধরন আবার গতানুগতিক ধারার নয়। ডিফেন্স, মাঝমাঠ দাপিয়ে প্রতিপক্ষ জালের ঠিকানা, ইংলিশ প্লেয়িং গ্রাফে এখন কেবল বেলিংহামেরই জয়জয়কার। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার অভাবনীয় পারফরম্যান্সের কথা যাদের মনে আছে, তাদের বেলিংহামের এই টুর্নামেন্টের গতিপথ দেখে কিছুটা বিস্ময় জাগতেই পারে। টানা দুটি নকআউট ম্যাচে জোড়া গোল করে তিনি ম্যারাডোনার সেই বিরল রেকর্ডের পাশে নিজের নাম খোদাই করেছেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে ফুটবল বিশ্বের মানচিত্রে নিজেকে যেভাবে মেলে ধরছেন তিনি, তাতে কিংবদন্তি পেলের কথা মনে পড়াটাও এখন আর বিচিত্র নয়। তার খেলার প্রতিটি মুভমেন্টে যেন লড়াইয়ের আত্মবিশ্বাস, আর প্রতিটি শটেই জয় ছিনিয়ে নেওয়ার তীব্র জেদ। তিনি মাঠে নামলে ইংল্যান্ডের সমর্থকরা যেন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আর তাই তো, সতীর্থ হ্যারি কেইন থেকে শুরু করে কোচ টুখেল সবারই আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন এই তরুণ।

ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ইংল্যান্ডের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। প্রথমার্ধ ছিল চরম কৌশলগত লড়াইয়ের সাক্ষী। নরওয়ে যেন মাঠে নেমেছিল তাদের পরিচিত ‘ভাইকিং’ স্পিরিট নিয়ে। তারা রক্ষণভাগকে জমাট রেখে মাঝেমধ্যেই ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগে হানা দিচ্ছিল। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে যখন অ্যান্ড্রেয়াস জেলডেরুপের দুর্দান্ত এক শট জর্ডান পিকফোর্ডকে বোকা বানিয়ে জালে জড়াল, তখন গ্যালারিতে নরওয়েজীয় সমর্থকদের উল্লাস ছিল আকাশচুম্বী। ইংল্যান্ড কিছুটা হলেও স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু বেলিংহামরা যেন চাপের মুখে জ্বলে উঠতেই বেশি পছন্দ করেন। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে অ্যান্টনি গর্ডনের কাছ থেকে বলটি যখন বেলিংহামের পায়ে পৌঁছাল, তখন নরওয়ের ডিফেন্ডারদের চোখের পলক ফেলারও সুযোগ ছিল না। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে তিনি যখন বল জালে জড়ালেন, তখন মায়ামির আকাশ যেন এবার ভাইকিংদের ‘রো’ ছাপিয়ে ইংলিশদের হুঙ্কারে কেঁপে উঠল।

দ্বিতীয়ার্ধও ছিল পুরোপুরি নরওয়ের দখলে। তারা একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে গেছে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগে। তবে থ্রি লায়ন্সদের রক্ষণের প্রতিটি ইঞ্চি তখন যেন ছিল একেকটি দুর্গের মতো। তবে কর্নার থেকে টরব্যোর্ন হেগেম যখন বল জালে জড়ালেন, তখন মনে হয়েছিল ইংল্যান্ড হয়তো এখান থেকেই পথ হারাচ্ছে। কিন্তু ভিএআর প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে সেই গোলটি বাতিল করা হয়। হালান্ডের ফাউল ছিল সেই সিদ্ধান্তের মূল কারণ। পুরো ম্যাচে যাকে নিয়ে ছিল ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আলোচনা, সেই হালান্ডকে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডাররা এদিন এক ইঞ্চিও জায়গা দেয়নি। দীর্ঘ ১৬ ম্যাচ পর জাতীয় দলের জার্সিতে গোলহীন থেকে মাঠ ছাড়লেন এই ম্যানচেস্টার সিটি তারকা। নরওয়ে কোচ স্টালে সোলবাকেন অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের শেষে যখন তাকে তুলে নিলেন, তখন হালান্ডের চোখেমুখে ছিল কেবলই হতাশা।

ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়াল, তখন দুই দলের খেলোয়াড়দের ক্লান্তি ফুটে উঠছিল প্রতিটি ধাপে। তবে ৯৩ মিনিটে মোর্গান রজার্সের একটি শট নরওয়ের গোলরক্ষক ওরজান নাল্যান্ডের হাত থেকে ফসকে গেল। সেই বলই যেন ইংল্যান্ডের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিল। বেলিংহামের সেই বল জালে জড়ানোর মুহূর্তটি ছিল ইতিহাস রচনার মতো। বিপরীতে নরওয়ের জন্য এ এক নিষ্ঠুর পরিণতি। তারা মাঠ ছেড়েছে মাথা উঁচিয়ে, কারণ দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে এসে তারা যে মান দেখাল, তা বিশ্ব ফুটবলকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।

ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করেছেন দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়ে। তিনি বলেন, ‘ফলাফলটি দুর্দান্ত, আমরা শেষ চারে পৌঁছেছি। এটি অসাধারণ। কিন্তু আমি আজকের পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তুষ্ট নই। আমরা নিজেরাই নিজেদের কাজকে কঠিন করে তুলেছি। আমাদের খেলা ছিল অগোছালো, প্রচুর টেকনিক্যাল ভুল ছিল এবং আমরা যথেষ্ট দ্রুত ছিলাম না। সত্য বলতে, আজ আমাদের ভাগ্য সহায় ছিল।’ টুখেলের এই কঠোর মূল্যায়ন বুঝিয়ে দেয়, সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যাওয়ার আগে দলের প্রতিটি খুঁত সারিয়ে নিতে কতটা সচেষ্ট তিনি। অন্যদিকে, নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাকেন চোখের জলে মাঠ ছাড়ার আগে বলেন, ‘ছেলেদের জন্য খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু উচ্চপর্যায়ের ফুটবলে এটিই নিষ্ঠুর বাস্তবতা। আমরা একটি শক্তিশালী দলের বিপক্ষে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়ের দেখা পাইনি।’

এদিকে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড এই ম্যাচে একটি অনন্য রেকর্ডে ভাগ বসালেন। পিটার শিলটনের ১৮টি ম্যাচ খেলার রেকর্ড ভেঙে তিনি এখন ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার গর্বিত মালিক। এছাড়া ২০২৬ বিশ্বকাপে কেইন এবং বেলিংহাম দুজনেই এখন পর্যন্ত ৬টি করে গোল করেছেন। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার, যখন ইংল্যান্ডের দুজন খেলোয়াড় একটি নির্দিষ্ট আসরে অন্তত পাঁচটি করে গোল করার কীর্তি গড়লেন।

আট বছর পর আরও একবার শেষ চারে টিকিট কাটা ইংলিশরা এবার যখন বুধবার আটলান্টায় লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে, তখন তা কেবল স্রেফ একটি ফুটবল ম্যাচই না, হয়ে উঠবে দুই প্রজন্মের লড়াই। একদিকে যেমন লিওনেল মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শেষ গোধূলি বেলার বর্ণিল আভা, অন্যদিকে বেলিংহামের তারুণ্যদীপ্ত জয়ধ্বনি। ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ডের সেই সোনালি স্মৃতি এখন আর কেবল পুরনো অ্যালবামের ধূসর পাতা নয়, বেলিংহামের হাত ধরে তা যেন বর্তমানের বাস্তবতায় নতুন করে ধরা দিচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত