টুর্নামেন্টের শুরুতে যদি কেউ আমাকে সম্ভাব্য সেমিফাইনালিস্টের নাম বলতে বলতেন, তাহলে আমি স্পেন, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের নাম নিশ্চিন্তে বলতাম। কিন্তু ইংল্যান্ডকে নিয়ে এতটা আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না। অথচ শেষ পর্যন্ত তারাই সেমিফাইনালে উঠে এসে প্রমাণ করেছে, বড় দলগুলোকে কখনোই আগেভাগে হিসাবের বাইরে রাখা যায় না। আমার কাছে এই সেমিফাইনালের সৌন্দর্য এখানেই, ইউরোপের তিন শক্তি এবং লাতিন আমেরিকার একমাত্র প্রতিনিধি আর্জেন্টিনা মুখোমুখি লড়াইয়ে নামছে।
টুর্নামেন্ট-জুড়ে ক্রোয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, মরক্কো, মিসর ও পর্তুগালও দারুণ ফুটবল খেলেছে। তারা হয়তো শেষ চারে নেই, কিন্তু নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে সমর্থকদের মন জয় করেছে। অন্যদিকে জার্মানির মতো দল ধারাবাহিকভাবে বড় মঞ্চে নিজেদের খেই হারিয়ে ফেলেছে। তবে বড় দলগুলোর ধারাবাহিকতাই আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচই ছিল ‘ডু অর ডাই’। একটি ভুল, একটি মুহূর্তের অসাবধানতা পুরো টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়ের কারণ হতে পারে। ইংল্যান্ড ও নরওয়ের ম্যাচে সেটিই দেখা গেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, নরওয়ে যেন নিজেদের পরিকল্পনার মধ্যেই বন্দি হয়ে পড়েছিল। ইংল্যান্ড শুরু থেকেই জানত, হালান্ডই প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তাই তাকে ঘিরে এমন পরিকল্পনা করা হয়েছিল যে ম্যাচজুড়ে তিনি নিজের স্বাভাবিক খেলাটাই খেলতে পারেননি। বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকারদের একজনকে যদি এভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায়, তাহলে পুরো দলের আক্রমণভাগই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আর্জেন্টিনার ম্যাচ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। আমার দৃষ্টিতে তারা নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি। তবে বড় দলের আরেকটি গুণ হলো, ভালো না খেলেও ম্যাচ জিতে নেওয়া। পেনাল্টি মিস করার পরও তারা মিশনের সঙ্গে জিতেছে। এই ধরনের জয় খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি অনেক বাড়িয়ে দেয়। নকআউট পর্বে কখনো কখনো সুন্দর ফুটবলের চেয়ে জয়টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটাও সত্য, সুইজারল্যান্ডের পারফরম্যান্স আমাকে বেশি মুগ্ধ করেছে। তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ, সংগঠিত এবং সাহসী ফুটবল খেলেছে। ফলাফল তাদের পক্ষে না গেলেও তারা প্রমাণ করেছে যে বড় দলগুলোর বিপক্ষে লড়াই করার সামর্থ্য তাদের রয়েছে।
রেফারিং ও ভিএআর প্রযুক্তি নিয়েও অনেক বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, আধুনিক ফুটবল এখন প্রযুক্তিনির্ভর। ভিএআর ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হলো মানবিক ভুল কমিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা। প্রযুক্তি চালুর পর অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক কমেছে, আবার নতুন বিতর্কও তৈরি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ফিফার প্রণীত আইন অনুযায়ীই। মাঠের রেফারি এবং ভিএআর দুজনই সেই আইন অনুসরণ করেন।
অনেকে বলেন, কোনো নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আমি এই যুক্তির সঙ্গে একমত নই। একজন রেফারিরও পেশাগত সম্মান আছে। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো দলকে সুবিধা দেবেন, এমন অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া করা উচিত নয়। জুলিয়ান আলভারেজের ঘটনাতেও দেখা গেছে, ফাউল না হলে হয়তো গোল হতো। আবার অনেক সময় বলের দখল, ফাউলের অবস্থান কিংবা আক্রমণের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সালাহকে ঘিরেও অতীতে নানা বিতর্ক হয়েছে, কিন্তু প্রতিটি ঘটনার আলাদা ব্যাখ্যা রয়েছে। তাই আবেগ দিয়ে নয়, আইনের আলোকে সিদ্ধান্তগুলো বিচার করা উচিত।
এখন সামনে অপেক্ষা করছে দুটি অসাধারণ সেমিফাইনাল। স্পেন ও ফ্রান্সের লড়াইকে আমি অঘোষিত ফাইনাল বলতেই রাজি। দুই দলই কৌশলগতভাবে পরিণত, মাঝমাঠে শক্তিশালী এবং বড় ম্যাচ জেতার মানসিকতা রাখে। যে দল ছোট ছোট ভুল কম করবে, তারাই এগিয়ে থাকবে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ম্যাচের গুরুত্ব শুধু ফুটবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইতিহাসের কারণে ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতিও আলোচনায় আসবে। তবে আমি বিশ্বাস করি, মাঠের ৯০ মিনিটে অতীতের ইতিহাস নয়, জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে বর্তমানের ফুটবল। আবেগ থাকবে, গ্যালারিতে উত্তেজনা থাকবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত, কৌশল এবং মানসিক দৃঢ়তাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেবে।
চারটি দলই শিরোপার স্বপ্ন দেখছে। এখন আর কোনো দ্বিতীয় সুযোগ নেই। একটি ভুল আপনাকে বিদায় করে দিতে পারে, আর একটি সঠিক সিদ্ধান্ত আপনাকে ফাইনালের টিকিট এনে দিতে পারে। তাই আমি মনে করি, সামনে অপেক্ষা করছে এমন দুটি ম্যাচ, যা হয়তো এই টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলের সাক্ষী হয়ে থাকবে।