সফলতায় সেজদা: ইউরোপীয় ফুটবলে মুসলিম পরিচয়ের নতুন উত্থান

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম

ইউরোপের রাজনীতিতে ইসলাম নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অভিবাসন, পরিচয় এবং ধর্মকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তপ্ত আলোচনা চলছে। 

তবে সেই একই ইউরোপে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এক নতুন প্রজন্মের মুসলিম ফুটবলার নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ্যে তুলে ধরে ভিন্ন এক বাস্তবতার চিত্র দেখাচ্ছেন। তাদের উপস্থিতি যেন প্রমাণ করছে, ইসলাম এখন ইউরোপীয় সমাজেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম বাস করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তাই ১৩টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইসলামের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশীলন ও প্রকাশ স্বাভাবিকভাবেই দৃশ্যমান। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জার্সি গায়ে খেলা মুসলিম ফুটবলারদের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রকাশ।

স্পেনের তরুণ তারকা ও বার্সেলোনার ফরোয়ার্ড লামিন ইয়ামাল সৌদি আরবের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলের পর সেজদা দিয়ে উদযাপন করেন। মুহূর্তটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। 

এর কয়েক মাস আগেই বার্সেলোনায় স্পেন ও মিসরের প্রীতি ম্যাচে গ্যালারির একাংশ থেকে ‘যে লাফায় না, সে মুসলিম’—এমন স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়ামাল লিখেছিলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন মুসলিম। ফুটবল মানুষের বিনোদন ও অনুপ্রেরণার জন্য, কারও ধর্মীয় বিশ্বাসকে অসম্মান করার জন্য নয়।’

বিশ্লেষকদের মতে, এমন বিদ্রূপ বা স্লোগান বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উগ্র ডানপন্থি গোষ্ঠী এবং কিছু মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন ধরে ‘খ্রিস্টান ইউরোপ’ বনাম ‘বহিরাগত ইসলাম’—এমন একটি বিভাজনের ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। যদিও ইতিহাস বলছে, খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলাম—উভয়েরই উৎপত্তি ইউরোপের বাইরে, একই ভৌগোলিক অঞ্চলে।

ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করে সমালোচনার মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা শুধু ইয়ামালের নয়। ২০২৪ সালে জার্মানির ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার রমজানের শুরুতে ইনস্টাগ্রামে এক আঙুল উঁচিয়ে একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন, যা ইসলামে তাওহিদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। 

কিন্তু জার্মান সংবাদপত্র বিল্ড-এর সাবেক প্রধান সম্পাদক জুলিয়ান রাইশেল্ট এটিকে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর সমর্থনের প্রতীক বলে দাবি করেন। পরে রুডিগার তার বিরুদ্ধে মানহানি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নিলেও শেষ পর্যন্ত মামলাটি আর এগোয়নি।

অন্যদিকে, সৌদি আরবের বিপক্ষে ইয়ামালের সেজদার কয়েক দিন আগেই সুইডেনের মিডফিল্ডার ইয়াসিন আইয়ারি তিউনিসিয়ার বিপক্ষে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলের পর একইভাবে সেজদা দেন। তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত আইয়ারি গোলের পর প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান জানিয়ে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতেও হাত তুলেছিলেন। 

কিন্তু তার এই উদযাপন নতুন করে পরিচয় ও জাতীয়তা নিয়ে বিতর্ক উসকে দেয়। সুইডিশ ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা জিম্মি আকেসনসহ অনেকেই আইয়ারিকে ‘প্রকৃত সুইডিশ’ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ নিয়ে নানা সমালোচনা দেখা যায়।

তবে আইয়ারির পরিবারের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তার বাবা আজুজ, যিনি তিউনিসিয়া থেকে সুইডেনে অভিবাসী হয়েছেন, ছেলেকে তিউনিসিয়ার হয়ে নয়, সুইডেনের প্রতিনিধিত্ব করার জন্যই উৎসাহিত করেছিলেন। সুইডিশ সংবাদমাধ্যম আফটনব্লাডেট-কে তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানরা সুইডেনের অংশ। তারা এখানেই জন্মেছে, এখানেই বড় হয়েছে, তাদের বন্ধুরাও এখানকার। আমি অভিবাসী হলেও ইয়াসিন তিউনিসীয় শিকড়ের একজন সুইডিশ নাগরিক। তাই সুইডেনের হয়ে খেলার পূর্ণ অধিকার তার রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবসময় চেয়েছি সে সুইডেনের হয়েই খেলুক। যে দেশ তাকে শিক্ষা, সুযোগ ও নিরাপত্তা দিয়েছে, সেই দেশের জন্য কিছু ফিরিয়ে দেওয়াটা তার দায়িত্ব বলেই আমি মনে করি। আজ তার অর্জনে আমি গর্বিত।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত