চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি- জুন) সারাদেশে রাজনেতিক দলীয় কোন্দল ও নির্বাচনী সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০৪ জন নারী ও শিশু। ছয় মাসে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৩৮৩ সাংবাদিক। বুধবার (১৫ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।’
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৮৩০ টি সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫৬ জন নিহত ও ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, জামায়াতের ৬ জন ও আওয়ামী লীগের ৩ জন এবং অন্যান্য দলের ৮ জন রয়েছেন। ৮৩০ টি সহিংসতার ঘটনার ৬৭৩ টিই (৮১%) ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ২৭৩ টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত ও ২ হাজার ৯২ জন আহত হয়েছেন।
ছয় মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ১৪৪ টি মামলা হয়েছে। এ সকল মামলায় ৩২৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২৪৫১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। এ সময়ে রাজনৈতিক মামলায় কমপক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৩ হাজার ৬৭ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অন্তত ২ হাজার ৪১৫ জন।
এইচআরএসএস’র তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসে ২০০ টি হামলার ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৩৪ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬০ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৪৯ জন সাংবাদিক। এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর অধীনে ৩৩ জন সাংবাদিককে আসামী করে পৃথক ১৫ টি মামলা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতায় সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ২৬১ টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। যেখানে, ২০২৫ সালের একই সময়ে ১৪১টি ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন নিহত এবং ১১৯ জন আহত হন।
এই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর ৫০ টি হামলার ঘটনায় ৫৬ জন আহত হয়েছেন, এবং ১৯ টি মন্দির, ১৫ টি প্রতিমা ও ৪৩ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩২ টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় ৯ জন নিহত, ৩৫ জন আহত হয়েছেন, এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ ১৪ জন । এছাড়া ৩৮ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত থেকে আটক করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে অন্তত ১৭৩ জনকে পুশ ইন করা হয়েছে।
ছয় মাসে বিচার বহির্ভূত হত্যার (হেফাজতে/নির্যাতনে/গুলি/বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু) ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে কারা হেফাজতে কমপক্ষে ৫৮ জন আসামী মারা গিয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬ জন কয়েদী ও ৩২ জন হাজতি। এর মধ্যে ১৫ জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী।
এইচআরএসএস’র প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন গুম/ জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ না থাকলেও গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলায় কোস্ট গার্ড পরিচয়ে মিরাজ শেখ (৩২) নামে এক যুবককে দুজন সিভিল পোশাকধারী কোস্টগার্ড সদস্য কর্তৃক তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গত ছয় মাসে ৩৩১ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ৭৪ জন নিহত ও ১০০৩ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে ও দুর্ঘটনায় ২১৬ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন, গত ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে এইচআরএসএস’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০৪ জন, যাদের মধ্যে ২৩৮ জন (৫৯%) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ৮৮ জন (২৭%) নারী ও কন্যা শিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে। এছাড়া ৪৭৬ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন যার মধ্যে ১৭৩ জন শিশু।
এইচআরএসএস’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ১ হাজার ৭৭ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৩০৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।