ডালাসের উত্তপ্ত মাঠ। একদিকে তারকায় ঠাসা এবং টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভীতি জাগানিয়া আক্রমণভাগ নিয়ে হাজির হওয়া ফ্রান্স, অন্যদিকে নিস্তেজ শুরু আর রক্ষণাত্মক কৌশলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্পেন। ফুটবলবিশ্বের চোখ ছিল দিদিয়ের দেশমের দুর্বার ফরাসিদের ওপরই। কিন্তু দিনের শেষে পরিসংখ্যান এবং বাস্তবতার নিরিখে টেক্সাসের আরলিংটন স্টেডিয়ামে যা ঘটল, তা কেবল একটি হার নয়, বরং এক সুশৃঙ্খল ফুটবলীয় দর্শনের কাছে ফরাসিদের নিস্তেজ আত্মসমর্পণ। ২-০ গোলের এই জয় ফাইনালে স্পেনের ১৬ বছর পর ফেরার গল্পটি তো লিখলই, পাশাপাশি প্রমাণ করল ফুটবলে নামিদামি নামের চেয়ে সমষ্টিগত শৃঙ্খলা কতটা শক্তিশালী।
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশল ছিল ফ্রান্সকে অক্সিজেনহীন করে রাখা। মাঠের ৬৫ শতাংশ দখল করে বল নিজেদের পায়ে রেখে স্পেন যে ‘পাসিং ক্যারোসেল’ তৈরি করেছিল, তাতে ফরাসি মিডফিল্ড এবং আক্রমণভাগ বারবার খেই হারিয়ে ফেলছিল। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে কিংবা মাইকেল ওলিসের মতো খেলোয়াড়দের জন্য বলের যোগান কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল স্পেনের রক্ষণভাগ।
মাঠের লড়াইয়ের চিত্রটা ছিল অনেকটা এমন, স্পেন যেন পুরো মাঠকে একটি দাবা বোর্ডের মতো ব্যবহার করছিল। মার্ক কুকুরেয়া যখন বাম প্রান্ত থেকে ক্রস দিলেন, তখন লুকাস দিনিয়ে বল বুক দিয়ে নামানোর সময় সামান্য অসতর্ক ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিদ্যুৎগতিতে হাজির হলেন লামিন ইয়ামাল। তার উপস্থিতির চাপে দিনিয়ে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে হিমশিম খেলেন এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে ইয়ামালকে ফাউল করে বসলেন। ম্যাচের ২২তম মিনিটে পেনাল্টি স্পট থেকে মিকেল ওয়ারজাবাল যখন ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়ালেন, তখন গ্যালারিতে থাকা ফরাসি সমর্থকদের উল্লাস নিমেষেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
গোল খাওয়ার পর ফ্রান্স ম্যাচে ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে একের পর এক। বিরতির ঠিক আগে এমবাপ্পে একবার প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের পেছনের ফাঁক খঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমোন সময়মতো ডিবক্সের বাইরে এসে বল ক্লিয়ার করে বিপদ এড়ান। উইলিয়াম সালিবার ইনজুরি ফ্রান্সের রক্ষণভাগে বাড়তি চাপ তৈরি করেছিল, আর সেই সুযোগটিই নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছিল স্পেন। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৮তম মিনিটে দানি ওলমো এবং পেদ্রো পোরোর মধ্যে এক শৈল্পিক ‘ওয়ান-টু’ পাসের মুহূর্ত যেন ম্যাচটি সেখানেই শেষ করে দিল। ওলমোর বাড়িয়ে দেওয়া বলটি পোরো যখন নিজের নিয়ন্ত্রণে নিলেন, তখন তার সামনে কেবল ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইনান। পোরোর নিখুঁত ফিনিশিং স্পেনের জয়সূচক সিলমোহর লাগিয়ে দিল।
ম্যাচের শেষ দিকে এমবাপ্পে একবার গোলরক্ষককে একা পেয়েছিলেন, কিন্তু তার শটটি সিমোনের পায়ে লেগে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। অন্যদিকে, স্পেনের বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেস এবং লামিন ইয়ামাল ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু ফরাসি রক্ষণভাগের শেষ মুহূর্তের তৎপরতায় তা আর হয়নি। এমবাপ্পের গোল করার মরিয়া চেষ্টায় মেজাজ হারিয়ে সিমোনের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া এবং হলুদ কার্ড পাওয়াটি ছিল তাদের অসহায়ত্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
ফ্রান্স ঠিক কোথায় হারল?: ফরাসিদের পরাজয়ের পেছনে কোনো একক কারণ দায়ী নয়, বরং এটি ছিল এক সামগ্রিক ব্যর্থতা। প্রথমত, স্পেনের উচ্চপর্যায়ের প্রেসিংয়ের কাছে ফ্রান্সের মিডফিল্ড কোনো কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেনি। অরেলিয়েন চুয়ামেনি কিংবা আদ্রিওঁ রাবিয়োট বল দখলে রাখতে হিমশিম খেয়েছেন, যার ফলে এমবাপ্পে বা ওলিসের কাছে বল পৌঁছায়নি। দ্বিতীয়ত, ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলায় স্পেন ছিল নিখুঁত। কুকুরেয়া যেভাবে ওলিসকে পুরো ম্যাচে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন, তা ফরাসি আক্রমণভাগের প্রধান অস্ত্রটিকে ভোঁতা করে দিয়েছিল। সালিবার ইনজুরি ফ্রান্সের রক্ষণভাগে ফাটল ধরালেও, মূল সমস্যাটি ছিল মাঠের মাঝখানে নিয়ন্ত্রণ হারানো। তারা স্পেনের এই পাসিংয়ের জালে আটকে গিয়ে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটি আর খেলতে পারেনি। অধিকাংশ সময় তাদের বলের পেছনে ছুটতে দেখা গেছে, যা তাদের শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলেছিল।
ম্যাচ শেষে তৃপ্ত স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘আমরা প্রায় চার বছর আগে একটি আইডিয়া নিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই আইডিয়ার প্রতি আমরা বিশ্বস্ত থেকেছি এবং তা-ই আমাদের আজ এখানে নিয়ে এসেছে। আজ আমরা বিশ্বের অন্যতম সেরা জাতীয় দলের মুখোমুখি হয়েছিলাম, কিন্তু তাদের সামনে ছিল বিশ্বের সেরা দল। এটাই পার্থক্য।’
অন্যদিকে, হারের পর হতাশ ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম বলেন, ‘আমরা আমাদের স্বাভাবিক পর্যায়ের চেয়ে কিছুটা নিচে ছিলাম এবং আগের ম্যাচগুলোর তুলনায় বেশি প্রযুক্তিগত ভুল করেছি। শারীরিকভাবেও আমরা এক ধাপ পিছিয়ে ছিলাম।’
স্পেনের জন্য এই জয়টি কেবল একটি ফাইনাল নিশ্চিত করা নয়, এটি তাদের পুনরুত্থানের দলিল। গত ইউরো সেমিফাইনাল এবং নেশনস লিগের পর এবার বিশ্বকাপের মঞ্চেও ফ্রান্সকে হারানো স্পেনের জন্য একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যেন একটি অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি করেছে লা রোহারা, যার সামনে দাঁড়ালেই দেশমের শিষ্যদের সব দম্ভ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। রদ্রি এবং ফ্যাবিয়ান রুইজদের মতো খেলোয়াড়রা মাঠের নিয়ন্ত্রণ এমনভাবে নিজের হাতে রেখেছিলেন যে, ফ্রান্সের কোচ ডাগআউটে অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই স্পেন খেলেছে মাপা ছন্দে। কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দিয়ে শুরু করা দলটির এই অবিশ্বাস্য রূপান্তরের পেছনে রয়েছে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অবিচল বিশ্বাস। পোরোর মতো রাইট ব্যাক যখন গোল করেন, কিংবা ওয়ারজাবালের মতো স্ট্রাইকার যখন গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে থাকা এমবাপ্পের মতো খেলোয়াড়দের আড়াল করে নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দেন, তখন বোঝা যায় দলটির গভীরতা কতটা। স্পেনের রক্ষণভাগ এই বিশ্বকাপে এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে, সাত ম্যাচের মধ্যে ছয়টিতেই তারা গোল হজম করেনি।
ফাইনালে এখন স্পেনের সামনে অপেক্ষা করছে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ডের চ্যালেঞ্জ। তবে যে ফর্মে তারা ফ্রান্সকে হারিয়েছে, তাতে রবিবারের ফাইনালে তারা যে ফেভারিট হিসেবেই নামবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ১৯ বছর বয়সী ইয়ামাল থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ রদ্রি, পুরো দল যেন এক সুতোয় গাঁথা। এই দলটি এবার ২০১০ সালের সেই সোনালি প্রজন্মের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার পথে। আর ফরাসিদের জন্য এই হার একটি বড় শিক্ষা হয়ে থাকল, যেখানে নাম এবং গ্ল্যামারের চেয়ে মাঠের পরিকল্পনা এবং কার্যকর প্রয়োগই শেষ কথা বলে।