বিশ্বকাপ ফুটবলের নাটাই ঘুড়ি

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৫১ এএম

তখন সময়টা এই ধরো ভোর ভোর। ধীরে ধীরে জেগে উঠছে হিজল বনের পাখিরা। খোলা আকাশের ছোপ ছোপ অন্ধকার লুকালো ওই শাড়াডাঙ্গার মাঠে গিয়ে। একঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে ওদিক পানেই ডানা ঝাপটিয়ে ধনুকের মতো। দূরে আকাশে ওড়া পাখিদের চেনা যায় না, সব এক রকম লাগে। এই সাত সকালে দল বেঁধে কোথায় যায় ওরা কে জানে! তবে মাঠের ওপারে হিজলের বন পেরিয়ে খানিক দূরে ডাকাতিয়া বিল। বিলজুড়ে থই থই করছে পানি। এই বর্ষায় বিলের চেহারা হয়েছে যেন একটা সাগর।

টুপলু কোনো দিন সাগর দেখেনি। ডাকাতিয়া বিলকে বর্ষাকালে যে সাগরের মতো লাগে সে কথা বলেছে নাছুমের মামা।

মামা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। তা পড়াক না, মামাকে তো মাস্টার বলে মনেই হয় না। ছুটির মধ্যে বাড়ি এলে কত শত গল্প যে করেন তিনি। ঠিক বন্ধুর মতো। ওদের তো মামাকে ছাড়তেই মন চায় না।

কদিন হলো ঈদ চলে গেছে, ছুটিও ফুরিয়ে গেল। আবার সেই স্কুল। টুপলুর স্কুল যেতে মন চায় না কিছুতেই। কলার ভেলায় চেপে ডাকাতিয়া বিল পেরোলেই পুবদিকে তাদের স্কুল। ওই ভেলায় চড়ার লোভেই সে কেবল স্কুলে যায়। পাড়ার কয়েকজন দল বেঁধে হৈচৈ করতে করতে স্কুল যাওয়া, ফেরার পথে এ ওর গায়ে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দেওয়া, শাপলা তুলে মালা গাঁথা।

আহারে দেখতে দেখতে পথটুকু শেষ হয়ে যায়। টুপলু ভেবে পায় না খুশির সময়টা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় কেন!

তা যাক, আজ সে কিছুতেই স্কুলে যাবে না ঠিক করেছে। বড় চাচা বাড়িতে, স্কুল না যাওয়ার কারণ কী দেখাবে টুপলু?

মেজাজ খারাপ।

ঝলমলে রোদ। নীল আকাশ চকচক করছে। মুঠো মুঠো মেঘ যেন ঘুড়ি উড়ছে। হঠাৎ এক খ- মেঘ ভেসে এলো। আর বৃষ্টি শুরু হলো। অবাক করা বৃষ্টি। বৃষ্টি চলে গেল।

টুপলুর হঠাৎ মনে পড়ে যায় স্বপনদের পাড়ায় ওরা আজ ঘুড়ি ওড়াবে। বর্ষাকালে ঘুড়ি ওড়ানো! কি জানি সে কেমন হবে। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি। ওর বড়দা নাকি যাদু জানে। যাদু দিয়ে ঘুড়ি ওড়ায়।

কিছুদিন আগে ডাকাতিয়া বিল উজিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসছিল। সে দিকে তাকিয়ে স্বপন বলল, ‘দেখ দেখ টুপলু কত পাখি উড়ে আসছে আমাদের দিকে। ও সে দিকে না তাকিয়ে বেশ কড়া করে বলে দিল, আমাকে টুপলু বলে ডাকবি না।’

‘তোর নাম তো টুপল্্ুই। তা কী বলে ডাকতে হবে?’

‘আজাদ বলে ডাকবি। এটা আমার স্কুলের নাম।’

ডাক নামের ওপর ওর খুব রাগ। একটু উনিশ বিশ হলেই বন্ধুরা ওকে টোপলা-পোটলা এসব বলে ডাকে। তখন ওর মেজাজ যায় খারাপ হয়ে। কে যে রেখেছে তার এই নাম! নাম নিয়ে ইয়ারকি একদম সহ্য করতে পারে না টুপলু।

‘আমি তোকে টুপলু বলেই চিনি, ওই

নামেই ডাকবো তোকে। আজাদ। ভারি আমার নামরে।’

ব্যাস লেগে গেল ঝগড়া যাচ্ছেতাই রকমের। মহানন্দে সেই স্বপনের সঙ্গে বসেই চলছে এখন ঘুড়ি ওড়ানোর প্রস্তুতি। ঘুড়ি ওড়ানোর সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া সে এক বিরাট ভজকটো ব্যাপার। যেন বিশ^কাপ খেলার প্রস্তুতি। সেই কাজে ওদের বোনরাও খুব সাহায্য করে। পিছু ছাড়ে না। সবারই লোভ নাটাই হাতে একটু ঘুড়ি উড়াবে। কত অল্পেই না ওরা খুশি থাকে।

ভাতের মাড়, কাচের মিহি গুঁড়ো মাখিয়ে সেই গলানো মিশ্রণে সুতোর গায়ে মাখিয়ে শুকিয়ে রেখেছে ওরা। খুব ধারালো হয়েছে সুতো। সেই সুতো স্বপনের বড় ভাই দীপনদা নাটায়ে পেঁচিয়ে পরিপাটি করে রেখেছে। আরও কত যে কাজ আছে। ভনো, গাবলু, নাছুম সবাই বড়দের ফাইফরমাই খাটছে।

গতবার বসন্ত উৎসবে দোলের দিনে কত রঙবেরঙের ঘুড়ি উড়িয়ে ছিল ওরা। গাবলোর দাদা বাদল, মাঞ্জা দেওয়া সুতো নাটাই থেকে যখন বাতাসের টানে সরসর করে যেতে থাকে তখন বেখেয়ালে হাত লেগে কেটে গেল তার দুটো আঙুল। বৃষ্টির ফোঁটার মতো তার হাত থেকে টুপটুপ করে রক্ত ঝরতে লাগল। সে কি কা-। ওরা তো ভাবল ঘুড়ি ওড়ানো মাথায় উঠল এবার। চোখের পলকে তমাল ছুটে কোথা থেকে মুঠোভরে নিয়ে এলো জার্মন লতা। দুহাতে ঘষে লাগিয়ে দিল বাদলের হাতে। ম্যাজিকের মতো রক্ত বন্ধ। তারপর শুরু হলো আবার হই হই। আনন্দ, ছুটোছুটি। ঘুড়ি কাটাকাটি। কার ঘুড়ি কে কেটছে তার ঠিক নেই। আরেক দল ঘুড্ডিপোকা ছুটছে সেই কাটা ঘুড়ির খোঁজে। একটা শিকারি ঘুড়ি ভোকাট্টা করেই যাচ্ছে। সেই সঙ্গে রঙ খেলা।

কিন্তু এবার উপলক্ষটা কী সেটাই তো বুঝতে পারছে না ওরা। দীপন দাদা ঘর থেকে বেরই বা হচ্ছে না কেন? গাবলো তো বলল, সব রেডি আছে। শুধু একটু নাকি ফিনিশিং টাচ দেওয়া বাকি আছে।

অবশেষে বের হলো দীপেন দাদা, হাতে তার সুতো বাঁধা রঙবেরঙের ঘুড়ি প্রজাপতির মতো উড়ছে। একেকটা ঘুড়ি একেকটা দেশের জাতীয় পতাকার মতো। ব্রজিল, স্পেন, মেক্সিকো, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, মরক্ক, জার্মান, জাপান, নরওয়ে, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র। কত দেশের নাম বলবো! ওদের সবার হাতে ধরিয়ে দিল একটা করে ঘুড়ি। দীপেনদা নিজে ধরে রইল আজেন্টিনার নীল-সাদা রঙের স্নিগ্ধ ঘুড়িটি।

বিশশ্বকাপ মেসির হাতে- ওদের চোখে স্বপ্ন উড়ছে ঘুড়ির সঙ্গে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত