অর্ধ যুগের মধ্যে সবশেষ দুটি পঞ্জিকা বছরে বিএনপির আয় বেড়েছে, সেই সঙ্গে ব্যয় কমায় সঞ্চয় হচ্ছে উদ্বৃত্ত অর্থ। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গতকাল রবিবার ইসি সচিব আখতার আহমেদের কাছে গত বছরের বিএনপির আর্থিক বিবরণী জমা দেয়। এতে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বিএনপির আয় হয়েছে ২২ কোটি ১৯ লাখ ৫৫ হাজার ১৮২ টাকা; আর ব্যয় হয়েছে ১৫ কোটি ২৬ লাখ ১০ হাজার ৮৫৭ টাকা।
এর আগে অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের বছর ২০২৪ সালে উদ্বৃত্ত আয়ের ধারায় ফেরে বিএনপি। সে বছরে ইসিতে জমা দেওয়া বিবরণী অনুযায়ী, বিএনপি আয় করেছিল ১৫ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪২ টাকা। ব্যয় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৮০ লাখ ৪ হাজার ৮২৩ টাকা। ওই বছর ব্যয়ের পর উদ্বৃত্ত ছিল ১১ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার ২২ টাকা।
তবে গণঅভ্যুত্থানের আগের চার বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিএনপির আয় কোনো বছরেই ব্যয়ের চেয়ে বেশি ছিল না। আবার আয়-ব্যয়ের পরিমাণও ছিল বেশ কম।
দলটির ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গণঅভ্যুত্থানের আগের বছর ২০২৩ সালে বিএনপির ব্যয়ের চেয়ে আয় কমে গিয়েছিল। সেবার আয় হয় ১ কোটি ১০ লাখ ৮০ হাজার ১৫১ টাকা, ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৬৫ লাখ ২৩ হাজার ৯৭০ টাকা। ২০২২ সালে দলটির মোট আয় ছিল ৫ কোটি ৯২ লাখ ৪ হাজার ৬৩২ টাকা এবং মোট ব্যয় হয় ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৩৩ হাজার ৮০৩ টাকা। ২০২১ সালে মোট আয় ছিল ৮৪ লাখ ১২ হাজার ৯৪৪ টাকা এবং ব্যয় ছিল ১ কোটি ৯৮ লাখ ৪৭ হাজার ১৭১ টাকা। আর ২০২০ সালে দলটির মোট আয় ছিল ৪ কোটি ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৪২৪ টাকা এবং মোট ব্যয় হয়েছিল ৪ কোটি ৮১ লাখ ৪ হাজার ১০২ টাকা।
আয় বাড়ার বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শাসনামলে অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। তারা নিয়মিত দলীয় কার্যালয়ে আসতে পারেনি। ফলে দলীয় চাঁদা বাকি পড়ায় আয় কমে গিয়েছিল।’
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত দুই বছরে দলে চাঁদা-অনুদান দেওয়ার নেতার অভাব পড়েনি। না চাইতেই বিএনপির নেতারা এখন দলীয় তহবিলে টাকা দিচ্ছেন। এর আগের বছরগুলোতে এটা ঘটেনি বলেই তখন আয় বাড়েনি।’
সাধারণত দলের সদস্যদের নিয়মিত চাঁদা, বিভিন্ন ব্যক্তি ও শুভাকাক্সক্ষীদের অনুদান এবং দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রির অর্থ থেকে দলীয় আয় দেখায় রাজনৈতিক দলগুলো। অন্যদিকে দলের সারা বছরের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, প্রচারপত্র ও পোস্টার প্রকাশনা, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কার্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং দুস্থ নেতাকর্মীদের সহায়তার খাতে ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়।
বিএনপির আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়া শেষে রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাদের অংশগ্রহণের ইস্যু নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন আর কে করবেন না সেটি আদালত ও নির্বাচন কমিশনের বিষয়। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তারাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’
আওয়ামী লীগ নেতাদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ঠেকাতে ইসিকে জামায়াতে ইসলামীর দেওয়া চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘অন্য রাজনৈতিক দল কী বলছে, তা এখানে বড় বিষয় নয়। প্রচলিত আইন অনুযায়ী কার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা আছে আর কার নেই, তা নির্ধারণের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এই এখতিয়ার সম্পূর্ণ তাদের।’
স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনটি দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে বলে আমাদের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম ঠিক করবে কীভাবে আমাদের প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
ইসিতে জমা দেওয়া আয়-ব্যয়ের হিসাব সম্পর্কে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘উদ্বৃত্ত যোগ হওয়ার পর বছর শেষে ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে ২৮ কোটি ৪ লাখ ৭১ হাজার ৬৮০ টাকা এবং হাতে নগদ রয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার ৭০০ টাকা। সব মিলিয়ে দলের চূড়ান্ত স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ৭ লাখ ৫১ হাজার ৩৬০ টাকা।’
রুহুল কবির রিজভী বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দলের নিরীক্ষিত আয়-ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। দলের অডিটর হিসাব নিরীক্ষা করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের অনুমোদনের পর তা কমিশনে দাখিল করা হয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য প্রতি বছর ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আগের পঞ্জিকা বছরের আয়-ব্যয়ের অডিট রিপোর্ট নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো দল পরপর তিন বছর হিসাব জমা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের নিবন্ধন বাতিলের বিধান রয়েছে।