জাপানের একটি ছোট শহরের মেয়র শোকো কাওয়াতা দেশটির ইতিহাসে প্রথম দায়িত্বে থাকা মেয়র হিসেবে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে গেছেন। সোমবার (২০ জুলাই)থেকে কার্যকর হওয়া তার এ সিদ্ধান্ত জাপানে যেমন আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
পশ্চিম জাপানের প্রায় ৬৯ হাজার জনসংখ্যার শহর ইয়াওয়াতার মেয়র শোকো কাওয়াতা ২০২৩ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে নির্বাচিত হয়ে দেশটির সর্বকনিষ্ঠ নারী মেয়রের স্বীকৃতি পান। তিনি জানান, মেয়র হওয়ার সময় থেকেই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।
কাওয়াতা বলেন, ইয়াওয়াতা সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা পেলেও মেয়রের জন্য এমন কোনো নীতিমালা ছিল না। ফলে তাকে নিজ উদ্যোগে এ বিষয়ে একটি ব্যবস্থা চালু করতে হয়েছে।
গত শুক্রবার সিটি হলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাওয়াতা বলেন, 'আমি নিজেও বিস্মিত হয়েছি জেনে যে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়া প্রথম মেয়র আমি। এতে বুঝতে পেরেছি, এতদিন জাপানে খুব কম তরুণী, এমনকি খুব কম নারীই মেয়র হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।'
মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়ার আগে তার শেষ দাপ্তরিক দায়িত্বগুলোর একটি ছিল ইয়াওয়াতার ঐতিহ্যবাহী তাইকো উৎসবের শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী মেয়রের বহনযোগ্য শিন্তো মন্দির (মিকোশি)-এর ওপরে ওঠার কথা থাকলেও অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় তিনি সেটির পেছনে হেঁটেই শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
গত বছর সানায়ে তাকাইচি জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হলেও দেশটির রাজনীতিতে এখনো লিঙ্গবৈষম্য প্রকট। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সর্বশেষ জেন্ডার গ্যাপ সূচকে ১৪৮ দেশের মধ্যে জাপানের অবস্থান ১১৮তম এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ১২৫তম।
কাওয়াতার মতে, বিশ্বের অন্যতম নিম্ন জন্মহারের দেশ জাপানে পরিস্থিতি বদলাতে হলে আরও সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমানে দেশটির আইনে নারীরা প্রায় ১৪ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটির অধিকারী। এ সময় তারা সাধারণত বেতনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এবং সন্তান জন্মদানের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা পান। তবে সরকারি কিছু কর্মচারী তুলনামূলক বেশি সুবিধা ভোগ করেন।
তিনি বলেন, 'লিঙ্গসমতা ও কর্মপরিবেশের সংস্কারের কথা অনেক বলা হয়। কিন্তু এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও সন্তান নিতে দ্বিধাবোধ করবেন না। তা না হলে জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে জনসংখ্যা হ্রাস এবং এর ফলে অর্থনৈতিক অবনতি ঠেকানো কঠিন হবে।'
কাওয়াতা জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকাংশ এবং সহকর্মীরা তার মাতৃত্বকালীন ছুটির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক গণমাধ্যম কাভারেজের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু সমালোচনা তাকে হতাশ করেছে। আগামী সেপ্টেম্বরে তার সন্তানের জন্ম হওয়ার কথা।
তিনি বলেন, 'অনেকেই আমাকে চিনতেন না। তারা শুধু মাতৃত্বকালীন ছুটির খবরের মাধ্যমে আমার সম্পর্কে জেনেছেন। কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, আমি নাকি কাজ না করে শুধু ছুটি নেওয়ার জন্যই মেয়র হয়েছি। এমন মন্তব্য আমাকে কষ্ট দিয়েছে।'
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইয়াওয়াতার অধিকাংশ বাসিন্দাই কাওয়াতার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তবে কয়েকজনের আপত্তি ছিল ছুটিকালীন তার পুরো বেতন পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও গৃহিণী চিয়ে ফুজিতা বলেন, 'আমি নিজেও একজন নারী এবং সন্তান জন্ম দিয়েছি। তাই একজন নারীর মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার অধিকার অবশ্যই থাকা উচিত। তবে ছুটির সময় তিনি শতভাগ বেতন পাবেন এ বিষয়টির সঙ্গে আমি একমত নই।'