যার সন্তান যায় সে বোঝে কষ্টের গভীরতা

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৫ এএম

‘অসুস্থতার কারণে ১১ দিন পর ওকে স্কুলে দিয়ে আসি। ও খুব হাসিখুশি মনেই গেল, কিন্তু আমার কোলে ফিরে এলো লাশ হয়ে। আমার সোনাপাখিটার শতভাগ শরীর পুড়ে গিয়েছিল। পোড়া মাংসগুলো ঝুলে ঝুলে পড়ছিল, মাথার চুলগুলো পুড়ে ছোট হয়ে গিয়েছিল। গায়ে কোনো জামাকাপড়, পরনে জুতা বা আইডি কার্ড কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। যে আগুনে আমার ছেলেটা পুড়েছে, সেই আগুনের কথা মনে পড়লে আজও নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এক বছর ধরে রাতে ঘুমাতে পারি না।’

কথাগুলো বলছিলেন উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ শিক্ষার্থী মাহিদ হাসান আরিয়ানের মা মনিকা আক্তার। গত বছর কলেজটিতে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এতে দগ্ধ হয়ে মারা যায় চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিদ। ছেলেকে হারিয়ে এখনো দিশেহারা মা মনিকা। হৃদয়বিদারক সেই দিনের স্মৃতিচারণ আর মোবাইলে সন্তানের ছবি দেখিয়ে অঝোরে কেঁদে ফেলেন তিনি।

ভয়াবহ প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। সময়ের সঙ্গে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলালেও বদলায়নি স্বজনহারা পরিবারগুলোর কান্না। স্বজনদের বুকে জ্বলছে শোকের আগুন। তাদের অভিযোগ, এখনো তারা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, শহীদী মর্যাদা ও কাক্সিক্ষত বিচার পাননি। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার সময় এবং পরে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য গোপনের অভিযোগও তুলেছেন তারা।

একই ট্র্যাজেডিতে ছেলে মোহাম্মদ বোরহানউদ্দিন বাপ্পী, মামাতো ভাই মাহিদ হাসান আরিয়ান ও ভাতিজা মোহাম্মদ নূর আশফিক হুমায়েরকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে আছেন মোহাম্মদ আবু শাহীন। তিনি বলেন, ‘১০ বছর সাধনার পর আমার এই ছেলেটা হয়েছিল। যার সন্তান যায়, কেবল সে-ই বোঝে এই কষ্টের গভীরতা। এক বছরে একটা রাতের জন্যও আমরা ঘুমাতে পারিনি। একটা সেকেন্ডের জন্যও বাচ্চাকে ভুলতে পারছি না। আমাদের জীবনটা একদম অসহনীয় হয়ে উঠেছে।’

আবু শাহীন অভিযোগ করেন, ট্র্যাজেডির পর স্বজনদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। বরং দুর্ঘটনার সময় এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক তথ্য গোপনের চেষ্টা করেছে মাইলস্টোন স্কুল কর্তৃপক্ষ। এতদিন পেরিয়ে গেলেও তারা ন্যায়বিচার কিংবা প্রাপ্য সহমর্মিতা পাননি বলে দাবি করেন।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হলেও এখনো সুরাহা মেলেনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মূল দাবি-দাওয়ার। ক্ষতিপূরণ ও সহানুভূতির জায়গায় সরকারের পক্ষ থেকে কাক্সিক্ষত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

ওই ঘটনায় নিহত সারিয়া আক্তারের বাবা রফিক মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল সোমবার আমার মেয়ের জন্য মিলাদ ছিল। ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এত সময় পার হলেও আমাদের কোনো দাবি বা অধিকার বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বলেন, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ফারুক হাইকোর্টে যে রিট করেছিলেন, সেখানে স্পষ্টভাবে নির্দেশ ছিল নিহতদের পরিবারকে ৫ কোটি টাকা, আহতদের ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ এবং উপযুক্ত শহীদী মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু সরকার বা কর্তৃপক্ষ এখনো সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেনি।

এদিকে ‘মাইলস্টোন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার’ সংগঠনের সভাপতি নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ট্র্যাজেডির পর ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কোনো প্রত্যক্ষ আলোচনা বা সমঝোতা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিহতদের পরিবারের জন্য ২০ লাখ টাকা এবং আহতদের জন্য ৫ লাখ টাকার প্রণোদনার ঘোষণা থাকলেও বর্তমান সরকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন জারি করে। তবে কোনো আলোচনা, সাক্ষাৎ বা সমবেদনা না জানিয়ে কেবল চিঠি দিয়ে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি শেষ করা মানবিক ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নয়। সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে বসে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছিলেন। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয় এবং পরে তেজগাঁও কার্যালয়ে যৌথ আবেদন জমা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ মেলেনি।

এ ঘটনায় মোট ৩৫ জন নিহত এবং ৬৩ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজন এখনো গুরুতর শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। তদন্ত কমিশনের সুপারিশে নিহতদের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচে ১ কোটি টাকা এবং ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ৮০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়। আর আহতদের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচে ৬০ লাখ টাকা এবং ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ৪০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা প্রণোদনার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এসব সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। নিহত শিশুদের অনেক অভিভাবক চাকরি হারিয়েছেন, কারও ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক ও মানসিক সংকটে রয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের মূল দাবি হলো, হাইকোর্টের নির্দেশনা ও তদন্ত কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং নিহতদের শহীদী মর্যাদা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদের সঙ্গে মানবিক সংলাপেরও আহ্বান জানানো হয়। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গত বছরের ২১ জুলাই অন্য দিনের মতোই কলেজে স্বাভাবিক ক্লাস হয়। স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাত্র ছুটি হয়েছে। তারা গেটের দিক যাচ্ছিল। বাইরে অপেক্ষা করছিলেন অভিভাবকরা। ঠিক তখনি বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভবনের ওপর বিধ্বস্ত হলে বিকট বিস্ফোরণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কোলাহলে মুখর ক্যাম্পাস মুহূর্তেই পরিণত হয় আতঙ্ক আর আর্তনাদের জনপদে। ধোঁয়া, আগুন আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকা পড়েন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা। প্রাণ বাঁচাতে কেউ জানালা দিয়ে লাফ দেন, কেউ আগুনের মধ্যেই বের হওয়ার চেষ্টা করেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে স্বজনদের আহাজারি, আর স্থানীয় বাসিন্দা, ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারীরা জীবন বাজি রেখে আহতদের বের করে হাসপাতালে পাঠান। কয়েক মিনিটের সেই দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় বহু প্রাণ, আহত করে অসংখ্য মানুষ এবং দেশের ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত দুর্ঘটনার জন্ম দেয়। একে একে প্রাণ হারায় ৩৫ জন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত