শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে নৈশভোজ

সবাইকে নিয়ে পথচলার অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৩ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় শুভেচ্ছা বিনিময় ও নৈশভোজ করেছেন রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিএনপির মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটের শীর্ষ নেতারা। এ সময় ভবিষ্যতে শরিকদের মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে নিয়ে আগামী দিনে পথচলার অঙ্গীকার করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় যমুনায় এ মতবিনিময় শুরু হয়। সরকার গঠনের পর এই প্রথম যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদ নির্বাচনের পর মিত্র দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই এ নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। দেরি করে বসার জন্য প্রধানমন্ত্রী মিত্র দলগুলোর নেতাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।

মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানান, সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর একসঙ্গে রাজনীতি করেছি, রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। আগামী দিনেও যুগপতের সবাই একসঙ্গে পথ চলব। শরিকদের সবাইকে মূল্যায়ন করা হবে। ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের বিভিন্ন জায়গা থেকে সরানোর কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। সভায় ভবিষ্যতেও একসঙ্গে পথচলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন শরিক দলের নেতারা।

অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টার কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কয়েক দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার সাক্ষাৎ হয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে উনি বলছিলেন ওনারা যে ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করেছেন, তখন অসহায়ের মতো ছিলেন। কারণ সরকারে ৬০ শতাংশের ওপরে সেই গুপ্ত বাহিনীর ইনফ্লুয়েন্স ছিল। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘নির্বাচনের পর এই গুপ্ত বাহিনী দিশাহারার মতো বক্তব্য রেখেছে এবং এখনো তারা বিভিন্ন রকম বক্তব্য রাখছে। ওই উপদেষ্টার বক্তব্য হচ্ছে এরা দিশাহারা হয়ে গেছে, ১৮ মাস তারা এমনভাবে পুরো জিনিসটাকে ব্যবহার করেছে তাদের পক্ষে। কিন্তু ১২ তারিখে জনরায়ের পর থেকে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।’

অতীতের আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যখন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। আজকে অনেকেই দাবি করেন। কারও নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না, যাদের একটি শব্দ ‘গুপ্ত’ ব্যবহার করলেই সাধারণ মানুষও চিনে। তাদের কিন্তু ওই সময়ে আমরা অনেক খুঁজেছি, পাইনি। আমি পাইনি দূরে থেকে, আপনারা কি কেউ পেয়েছিলেন রাজপথে তাদের? শেষের দিকে কিছু কিছু জায়গায় তাদের দেখেছি। কিন্তু ১৭ বছর বিভিন্ন জায়গায় আমরা তাদের দেখিনি’

শরিক নেতাদের সম্মানে প্রধানমন্ত্রী এ নৈশভোজ দেন। প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে কুশলবিনিময় করেন এবং তাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী নেতাদের সঙ্গে একই টেবিলে খাবার খান। এ টেবিলে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টির মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু।

এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা জানিয়ে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক সাইফুল হক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম বক্তব্য রাখেন।

মতবিনিময় সভা শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রসংস্কার হবে। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। জাতীয় ঐক্য ধরে রাখা, রাষ্ট্রসংস্কারের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে সমন্বয় জোরদারে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ও মতবিনিময় করবেন বলে জানান তিনি। জোটবদ্ধভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদের যে আইন হয়েছে তাতে দলীয়ভাবে নির্বাচন করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বৈঠকে অংশ নেয়নি দুদল

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বৈঠকে ৪১ রাজনৈতিক দলের ১৮৪ সদস্য অংশ নেন। তবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। বিএনপি সরকারে যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই দল দুটি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যে বিএনপিকে নৈশভোজে অংশ না নেওয়ার কারণ জানিয়ে নিজেদের এ অবস্থান স্পষ্ট করেছে দল দুটি।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ আসন থেকে ছাড়ের প্রত্যাশা করেছিলেন আ স ম আবদুর রবের স্ত্রী ও জেএসডির সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রব। কিন্তু ছাড় না দেওয়ার পর থেকেই বিএনপির সঙ্গে দলটির মান-অভিমান চলে আসছে। এ ছাড়া সরকারে মূল্যায়ন না পাওয়া এবং অসুস্থ আবদুর রবকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ দেখতে না যাওয়ায় মনোক্ষুণœ হয় দলটি। অপরদিকে নির্বাচনে জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে চার আসনে ছাড় দিলেও তাদের বিজয়ী করার জন্য মাঠপর্যায়ে কাজ করেননি বিএনপির অনেকেই। সরকার গঠনের পর দলটির নেতাদের গুরুত্ব না দেওয়া এবং সব দলের সঙ্গে একত্রে নৈশভোজ হওয়ার কারণে দলটির নেতারা নৈশভোজ বর্জন করেছে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের সিদ্ধান্তে আমরা আপাতত যাইনি। আমরা আরও সময় নিতে চাই। আমরা এককভাবে বৈঠক করতে চাই।

অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, শাহাদাত হোসেন সেলিম, রেদোয়ান আহমেদ প্রমুখ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

শরিক দলের জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা, জমিয়তে উলামায়ের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম, সাম্যবাদী দলের নুরুল ইসলাম, ইসলামিক পার্টির আবুল কাসেম, কল্যাণ পার্টির শামসুদ্দিন পারভেজ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, জাগপার খন্দকার লুৎফুর রহমান, ডেমোক্রেটিক লীগের মহিউদ্দিন কাদরি শওকত ও খোকন চন্দ্র দাস, বাংলাদেশ ন্যাপের শাওন সাদেকী, ন্যাপ ভাসানীর আজহারুল ইসলাম, বিকল্পধারা বাংলাদেশের নুরুল আমিন ব্যাপারী, গণ দলের এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী, ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা আবদুল করীম, বাংলাদেশ সংখ্যালঘু জনতা পার্টির সুকৃতি কুমার ম-ল, গণফোরামের মিজানুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর ও ফারুক হাসান, আমজনতা দলের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মিয়া মসিউজ্জামান ও তারেক রহমান, এনডিএমের ববি হাজ্জাজসহ ৪১ দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত