'আমরা শুধু বাঁচতে চাই'

হামাসের নতুন নেতা নির্বাচন, গাজায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০২:০৫ পিএম

হামাসের নতুন নেতা হিসেবে খালিল আল-হাইয়া নির্বাচিত হলেও গাজার সাধারণ মানুষের কাছে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে যুদ্ধ, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন নেতৃত্ব নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও অধিকাংশ বাসিন্দার প্রধান দাবি, যুদ্ধের অবসান এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ।

সম্প্রতি হামাসের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে সাবেক রাজনৈতিক প্রধান খালেদ মেশালকে পরাজিত করে নতুন নেতা নির্বাচিত হন খালিল আল-হাইয়া।

তবে এই ঘোষণাকে ছাপিয়ে গাজার মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা এখন একটি নিরাপদ বাসস্থান, পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রতিদিনের জীবন রক্ষার লড়াই।

চলমান যুদ্ধে নিজের কারখানা হারানো ৬৩ বছর বয়সী নোমান সালেহ বলেন, মানুষ আজ চরম কষ্টে আছে। তারা ক্ষুধার্ত, অপমানিত। আজ জনগণের পাশে কে আছে? কেউ নেই।

তিনি সব রাজনৈতিক পক্ষের সমালোচনা করে বলেন, যেখানে দলাদলি থাকে, সেখানে ব্যর্থতা থাকে। জাতীয় স্বার্থ কোনো সংগঠনের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়।

তার মতে, আল-হাইয়া বা অন্য কেউ নেতা হলে আমাদের জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে না। আমরা এমন একজনকে চাই, যিনি দেশের প্রতি অনুগত, সৎ এবং জনগণের কষ্ট বোঝেন।

'আমরা শুধু বাঁচতে চাই'

২৮ বছর বযসী আলী আবু আমশি যুদ্ধের সময় বাবা-মা ও এক ভাইসহ পরিবারের ২২ সদস্যকে হারিয়েছেন। গাজা সিটি থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া এই তরুণ বলেন, দীর্ঘদিনের যুদ্ধ মানুষের কাছে রাজনৈতিক প্রশ্নকে গৌণ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, এই খবর আমাদের জীবনে কোনো পার্থক্য আনে না। আমরা শুধু বাঁচতে চাই। সীমান্ত খুলে দেওয়া হোক, আমরা যেন খাবার পাই, পানি পাই এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারি।

তার ভাষায়, আমাদের কে শাসন করবে, কে নির্বাচিত হবে, এসব নিয়ে আর ভাবতে চাই না। যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, আমরা শুধু বাঁচতে চাই। এই যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। আমি প্রিয়জনদের হারিয়েছি। মনে হয় আমি ভেতরে ভেতরে মৃত, তবুও বেঁচে আছি।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর একই যুদ্ধ, একই কষ্ট ফিরে আসে। যদি আমাদের খাবার, পানি এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া যায়, সেটাই যথেষ্ট। আজ গাজার রাস্তাঘাট আবর্জনায় ভরা। এভাবে কি জীবন চলে? আমরা পরিবর্তনের আশা করি।

হামাসের বার্তা: নীতির ধারাবাহিকতা

ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মাহমুদ হানিয়েহ মনে করেন, খালিল আল-হাইয়ার নির্বাচন হামাসের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। তার মতে, এর মাধ্যমে সংগঠনটি জানিয়ে দিয়েছে যে তারা তাদের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অবস্থান এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়।

তিনি বলেন, ইসরায়েল মনে করে, ৭ অক্টোবরের হামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নেতৃত্বের মধ্যে খালিল আল-হাইয়া অন্যতম। তাকে নেতা নির্বাচনের মাধ্যমে হামাস বোঝাতে চেয়েছে যে তারা ওই ঘটনাকে তাদের কৌশলগত পথের অংশ হিসেবেই দেখে।

তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে হামাস রাজনৈতিকভাবে কিছু নমনীয়তা দেখালেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নীতি থেকে সরে আসেনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আইনসভা নির্বাচন ফিলিস্তিনিদের জন্য নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা

প্রায় দুই দশক ধরে গাজা শাসনের পর হামাস আগেই ঘোষণা দিয়েছে যে তারা তাদের সরকার বিলুপ্ত করে ক্ষমতা একটি ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করবে।

এই প্রশাসন, ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি), জাতিসংঘের সমর্থনপুষ্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গঠিত হয়েছে। বর্তমানে কমিটির সদর দপ্তর মিসরের কায়রোতে রয়েছে। তবে এখনো ইসরায়েল কমিটির সদস্যদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।

আস্থার সংকটে সাধারণ মানুষ

গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তাফা ইব্রাহিমের মতে, হামাসের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতার প্রতিফলন।

তিনি বলেন, অনেক মানুষ এখন আর হামাসকে গাজার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখেন না। তারা এমন একটি ব্যবস্থার পক্ষে, যেখানে হামাস প্রশাসনিক বা বেসামরিক শাসনে ভূমিকা রাখবে না।

তার মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তন যদি মানুষের জীবনে বাস্তব উন্নতি না আনে, তাহলে এসব নির্বাচন সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্বহীনই থেকে যাবে।

ইব্রাহিম বলেন, মানুষ যুদ্ধের অবসান চায়। যদি তাদের সামনে নতুন নির্বাচন কিংবা যুদ্ধের অবসানের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে, তবে তারা নিঃসন্দেহে যুদ্ধ শেষ হওয়াকেই বেছে নেবে।

তিনি আরও বলেন, আজ মানুষের প্রশ্ন, কে নেতা হলো, তা নয়; বরং এই নেতৃত্ব যুদ্ধ থামাতে, সমঝোতায় পৌঁছাতে এবং মানুষের বাস্তব জীবন বদলাতে কী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত