দেশে দুর্নীতি দূর না হলে হুন্ডি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচারের দুটি প্রধান পথ হলো ওভার ইনভয়েসিং ও হুন্ডি। তাই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া হুন্ডি বন্ধ করা যাবে না।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীর বনানীতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত ‘ইনক্লুসিভ ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম (আইআইপিএস) ইন বাংলাদেশ এন্ড ক্রস-বর্ডার রেমিটেন্স এজ এ ইউজ কেস’ শীর্ষক এক কর্মশালায় তিনি এ কথা বলেন।
এতে সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার। প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার ও পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের বাইরে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের বড় অংশ বিদেশেই থেকে যায়। সেই অর্থ পাচারের দুটি প্রধান মাধ্যম হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ওভার ইনভয়েসিং (আমদানি পণ্যে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো) এবং হুন্ডি।
তিনি বলেন, যতদিন দেশে মূলধন হিসাবের সীমাবদ্ধতা এবং দুর্নীতি থাকবে, ততদিন হুন্ডি থাকবেই। হুন্ডির পরিমাণ কত হবে, তা নির্ভর করবে মূলধন হিসাব কতটা উদার করা হচ্ছে এবং দুর্নীতি কতটা কমানো যাচ্ছে তার ওপর।
ডিজিটাল লেনদেনে ফি কমানোর আহ্বান জানিয়ে সাবেক এ গভর্নর বলেন, ক্যাশলেস লেনদেন জনপ্রিয় করতে বাংলা কিউআরসহ সব ধরনের ডিজিটাল লেনদেন সম্পূর্ণ ফিমুক্ত করতে হবে। পরে ধাপে ধাপে ১০ পয়সা করে ফি আরোপ করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেনে ১ থেকে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত যে ফি নেওয়া হয়, তা সরকার ভর্তুকি হিসেবেও বহন করতে পারে। ভারত ও পাকিস্তানে ডিজিটাল লেনদেনে কোনো ফি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদেরও এই ফি শূন্য করে দেওয়া উচিত।’
আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রবাসী আয়ের প্রণোদনার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়, সেখান থেকে ডিজিটাল লেনদেনের মাশুলের খরচ বহন করা যেতে পারে। বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা প্রবাসী আয় প্রণোদনায় দেওয়া হয়। এর থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ডিজিটাল লেনদেনের ফি ভর্তুকি হিসেবে ব্যবহার করলে এটি আরও জনপ্রিয় হবে।
তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। এর ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ অর্থের ব্যবহার বেড়েছে। তাই ভর্তুকি ছাড়া ডিজিটাল লেনদেন জনপ্রিয় হবে না।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের খণ্ডিত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে একীভূত করে আইআইপিএস চালুর মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে। বর্তমানে দেশে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো পৃথক বা ক্লোজড-লুপ ব্যবস্থায় পরিচালিত হওয়ায় এক সেবা প্রদানকারী থেকে অন্য সেবা প্রদানকারী বা ব্যাংকে সহজে তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর করা যায় না।
এতে আরও বলা হয়, গ্লোবাল ফিনডেক্স ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ব্যাংক হিসাব রয়েছে মাত্র ৪৩ শতাংশের। এর মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করেন ৩৪ শতাংশ। আইআইপিএস একটি ওপেন-লুপ ও ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট ব্যবস্থা। যার মাধ্যমে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা তাৎক্ষণিক লেনদেন করা যাবে।