কর বকেয়া সংকটে গুরুদাসপুর পৌরসভা, ২৫ মাস বেতন নেই কর্মচারীদের

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০২:২৫ পিএম

নাটোরের গুরুদাসপুর পৌরসভায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা হোল্ডিং ট্যাক্সের বকেয়া এখন প্রায় ২ কোটি টাকা। কর আদায়ে নানা উদ্যোগ ও রিবেট সুবিধা দেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিলছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনে। টানা ২৫ মাসের বেতন বকেয়া থাকায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একই সঙ্গে স্থবির হয়ে পড়েছে পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম।

পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার ৯২৭ টাকা। আগের অর্থবছরে এ বকেয়া ছিল ১ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ৫০৪ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বকেয়ার অঙ্ক আরও বেড়েছে।

গত ২৯ জুন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৪৪ কোটি ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়। বাজেটের সঙ্গে প্রকাশিত কর আদায়ের হালনাগাদ চিত্রে উঠে আসে উদ্বেগজনক এ তথ্য।

পৌরসভার হিসাব অনুযায়ী, ৮ হাজার ৯৯৯টি হোল্ডিংয়ের বিপরীতে আগের বছরের বকেয়া ও চলতি বছরের দাবিসহ মোট করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ২৩ হাজার ৪৯৭ টাকা। এর মধ্যে আদায় হয়েছে ১ কোটি ৮২ লাখ ৫২ হাজার ৫৭০ টাকা, যা মোট দাবির মাত্র ৪৮ শতাংশ। ফলে এখনো ৫২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি টাকা অনাদায়ী রয়ে গেছে। 

পৌরসভার কর আদায়কারী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানান, সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কর পরিশোধের প্রবণতা সন্তোষজনক হলেও কয়েকটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কিছু সরকারি দপ্তরের বিপুল কর বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে নাজিম উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বকেয়া প্রায় ৫০ লাখ টাকা, বেগম রোকেয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রায় ৩৫ লাখ টাকা, রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজের ১৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এছাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ১ লাখ এবং ফায়ার সার্ভিসের ৮০ হাজার টাকা কর বকেয়া রয়েছে।

এ বিষয়ে নাজিম উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আফসার আলী এবং রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন জানান, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিলে অর্থসংকট থাকায় কর পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে বকেয়া কর পরিশোধ করা হবে।

কর আদায়ে দীর্ঘসূত্রতার সবচেয়ে বড় মাশুল দিচ্ছেন পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পৌরসভা কর্মকর্তা-কর্মচারী ফেডারেশনের আহ্বায়ক ও সহকারী কর আদায়কারী দিল মোহাম্মদ বলেন, বিগত দুই মেয়রের আমল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ২ বছর ১ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। এর ফলে রাজস্ব খাতের ৬৫ জন এবং মাস্টার রোলে কর্মরত ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।

এ বিষয়ে পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, বকেয়া কর আদায়ের লক্ষ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং করদাতাদের জন্য রিবেট সুবিধাও অব্যাহত রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত কর আদায় বৃদ্ধি পেলে পৌরসভার আর্থিক সংকট কাটিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ এবং স্থবির উন্নয়ন কার্যক্রম আবারও গতি ফিরে পাবে।

গুরুদাসপুর পৌরসভার বর্তমান চিত্র যেন একটি কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—একদিকে অনাদায়ী করের পাহাড়, অন্যদিকে বেতনহীন কর্মচারীদের দীর্ঘশ্বাস। সময়মতো কর পরিশোধ এবং কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগই পারে এই সংকট থেকে পৌরসভাকে উত্তরণের পথ দেখাতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত