একটি বাগান, এক মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৪ পিএম

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ গ্রামের বাসিন্দা রাজু আহমদ এখন একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত নাম। এক সময় বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগে ব্যর্থ হলেও হার না মানা এই মানুষটি কৃষিকে আঁকড়ে ধরে বদলে দিয়েছেন নিজের জীবনের গতিপথ।

নানা ব্যর্থতার পর রাজু আহমদ উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ ও সহযোগিতায় মাল্টা, কমলা ও লেবু চাষে আগ্রহী হন। প্রায় এক একর জমিতে মাত্র ৯০টি চারা রোপণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার নতুন পথচলা। শুরুতে অনেকেই তার এই উদ্যোগকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন, এমনকি পরিবারেও ছিল সংশয়। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই সংশয় রূপ নেয় বিস্ময় ও প্রশংসায়।

প্রথম দিকে প্রায় দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করে শুরু করা এই বাগান বর্তমানে একটি লাভজনক কৃষি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। শুরু করার মাত্র এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই তিনি ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার ফল বিক্রি করতে সক্ষম হন। বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে ৭০০টিরও বেশি ফলদ বৃক্ষ। মৌসুমে এখানকার মাল্টা, কমলা ও লেবু স্থানীয় বাজার ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলে পাইকারিভাবে বিক্রি হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর তিনি কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন।

এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় রাজু আহমদ নিজের স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং আরও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলা কৃষি অফিসের নিয়মিত তত্ত্বাবধানে তিনি জৈব সার ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলগাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কৃষি অফিস থেকে প্রাপ্ত উপকরণ ব্যবহার করে নিজেই জৈব সার তৈরি করছেন, যা তাঁর বাগানকে আরও উৎপাদনশীল করে তুলেছে।

কৃষি উদ্যোক্তা রাজু আহমদ বলেন, আমি এক সময় নানা ব্যবসা করেও ব্যর্থ হয়েছি। তখন অনেকেই আমাকে নিরুৎসাহিত করেছে। কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। নিজের লক্ষ্য ঠিক রেখে পরিশ্রম করেছি। আজ এই বাগানই আমার পরিচয়।

তিনি আরও বলেন, এই মাল্টা-কমলার বাগান আমাকে শুধু আর্থিক স্বচ্ছলতাই দেয়নি, দিয়েছে আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি। আমি বিশ্বাস করি, দেশের মাটিতে, নিজের গ্রামেই থেকে সফল হওয়া সম্ভব। যুবকদের বলবো বেকার বসে না থেকে কৃষি কিংবা যেকোনো বৈধ উদ্যোক্তা কাজে যুক্ত হোন। ইনশাআল্লাহ, সফলতা আসবেই।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার মনোয়ার হোসেন বলেন, রাজু আহমদ একজন অত্যন্ত পরিশ্রমী, আগ্রহী ও উদ্যমী কৃষি উদ্যোক্তা। উপজেলা কৃষি অফিস বড়লেখার পরামর্শ ও সহায়তায় তিনি পরিকল্পিতভাবে মাল্টা ওয়ান জাতের বাগান গড়ে তুলেছেন। শুরু থেকেই তাকে উন্নতমানের চারা, সার, বালাইনাশক, সেচ সুবিধা ও নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শুকনা মৌসুমে পানির সংকট দূর করতে ডিপ ইরিগেশন ব্যবস্থা এবং জৈব সার ব্যবহারের জন্য ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনে সহায়তা করা হয়েছে। এর সুফল হিসেবে তার বাগানে ভালো ফলন আসছে এবং তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। রাজু আহমদের এই সাফল্য বড়লেখার অন্যান্য কৃষকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আগ্রহী কৃষকরা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে তাদেরকেও এ ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।

আজ রাজু আহমদের এই কৃষি উদ্যোগ বড়লেখা উপজেলার আশপাশের অনেক তরুণ ও কৃষকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। এক সময়ের ব্যর্থ মানুষটি এখন নিজ গ্রামে একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার গল্প প্রমাণ করে সঠিক পরিকল্পনা, অধ্যবসায় এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চললে কৃষিই হতে পারে টেকসই উন্নতির শক্ত ভিত্তি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত