জুলাই গণঅভ্যুত্থান কারও একক পৈতৃক সম্পত্তি নয় বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি সার্বজনীন আন্দোলন। এ আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। তাই কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের এ আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করার সুযোগ নেই।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের স্মরণে আয়োজিত এক স্মরণসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ইশরাক হোসেন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কারও একক পৈতৃক সম্পত্তি নয়। আপনারা জুলাইকে বিক্রি করবেন না। জুলাই যে সার্বজনীন একটি আন্দোলন ছিল, সেটিকে সেভাবেই রাখতে হবে। জুলাইয়ের সব শহীদের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে, বাংলাদেশের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন এবং যারা আহত হয়েছেন, তারা জাতির গর্ব। তাদের আত্মত্যাগের কারণে বাংলাদেশ একটি নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়েছে। রাষ্ট্র তাদের কাছে চিরঋণী থাকবে।
আহত জুলাই যোদ্ধাদের প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আহত, অঙ্গহানি হওয়া, দৃষ্টিশক্তি হারানো, চোখে গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি মাসিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, আহত জুলাই যোদ্ধাদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে পুনর্বাসন ও ভাতা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। দেশের সরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন, রাশিয়া ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। অনেকের বিদেশে চিকিৎসা এখনো চলছে।
শহীদ পরিবারের বিষয়ে তিনি বলেন, শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এককালীন ৩০ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ওই অর্থ বণ্টন করা হয়েছে।
ইশরাক হোসেন বলেন, নতুন অর্থবছরে শহীদ এবং গুরুতর আহত ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করা জুলাই যোদ্ধাদের জন্য বিনামূল্যে আবাসনের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবাসন নির্মাণ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তা বরাদ্দ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আহত জুলাই যোদ্ধাদের শুধু সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে রাখতে চায় না সরকার। তাদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
‘কেউ ছোট ব্যবসা করতে পারবেন, কেউ খামার করতে পারবেন, আবার যারা শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন কিন্তু অন্য সক্ষমতা রয়েছে, তাদের ডেস্ক জবের সুযোগ তৈরি করা হবে। এ লক্ষ্যে ১৭টি মন্ত্রণালয়কে সমন্বয় করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে,’ বলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, আহত জুলাই যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে।
যাত্রাবাড়ীতে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের দাবির প্রসঙ্গে ইশরাক হোসেন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ী ছিল আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট। এখানে অনেক মানুষ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন এবং অনেকে শহীদ হয়েছেন। তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের যে দাবি উঠেছে, তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ইনশাআল্লাহ, প্রধানমন্ত্রী এটি করার জন্য অতি শিগগিরই অনুমোদন দেবেন।’
সম্প্রতি একটি জাতীয় অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার ঘটনার সমালোচনা করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কোনো বিষয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে তা জানানোর জন্য গণতান্ত্রিক ও সভ্য অনেক পথ রয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। কোনো বক্তব্য বা অভিযোগ থাকলে যোগাযোগের অনেক পদ্ধতি ছিল। কিন্তু বিদেশি অতিথিদের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
ইশরাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশে একাধিক রাজনৈতিক দল থাকবে এবং সবারই মতপ্রকাশ, সভা-সমাবেশ ও প্রতিবাদ করার গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে। তবে সেই অধিকার প্রয়োগ করতে হবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ একটি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্ন কোনোভাবেই হিংসা, প্রতিহিংসা বা বিভাজনের রাজনীতির কারণে ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না।
‘আমরা কি আবারও একই ধরনের প্রতিহিংসা ও হিংসাত্মক রাজনীতির দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই শহীদদের জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছিল? মোটেই তা নয়,’ বলেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আন্দোলনে বিএনপির পাশাপাশি গণঅধিকার পরিষদ, এনডিএ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে ছিলেন। তাদেরও অনেকে শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন। তাই এ আন্দোলনের ইতিহাস কোনোভাবেই এককভাবে লেখা বা দাবি করা উচিত নয়।
ইশরাক হোসেন বলেন, ‘৭১-এর ইতিহাস যেন আমরা বিকৃত না করি, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও যেন বিকৃত না করি। এই গণঅভ্যুত্থানের কোনো একক দাবিদার হতে পারে না।’
তিনি সবাইকে শান্তি ও ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে যেন বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার জনগণের ঘাড়ে চেপে বসতে না পারে, সেজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
‘আমরা এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, যে রাষ্ট্র হবে বাংলাদেশের জনগণের। যেখানে জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র ও মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে,’ বলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৫ সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিরীন সুলতানা, ঢাকা মহানগর দক্ষিন বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আলহাজ্ব নবী উল্লাহ নবী প্রমুখ। এছাড়া
যাত্রাবাড়ী এলাকার বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত জুলাই যোদ্ধা এবং স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
