চার দেয়ালে ঘেরা সুরম্য অট্টালিকার বাসিন্দা কিংবা নগর-মহানগরের ফুটপাত থেকে শুরু করে মফস্বলের একজন ভোক্তা যে চা পান করে সতেজ হয়ে ওঠে, সেই চায়ের প্রতি কাপে জড়িয়ে আছে বাগান মালিকদের কষ্ট। কারণ বাগান মালিকরা চা বিক্রি করে উৎপাদন খরচই তুলতে পারেন না।
বাজারদর অনুযায়ী, নিলামে প্রতি কেজি চা ২৪৫ টাকায় বিক্রি করলে খুচরা পর্যায়ে এক কাপ (২ গ্রাম) চায়ে তিনি পান মাত্র ৪৯ পয়সা। ১০ টাকায় এক কাপ চা বিক্রি হলে বাগান মালিকের ভাগ্যে জুটে ৫ শতাংশেরও কম।
পাশর্^বর্তী দেশগুলোর চা বোর্ডের তথ্য বলছে, এক কাপ চায়ে ভারতের বাগান মালিক পান ০.৬৫ রুপি (আইএনআর) বা ৮৪ পয়সা (ইন্ডিয়া টি বোর্ড) এবং শ্রীলঙ্কার বাগান মালিক পান ২.০৯ শ্রীলঙ্কান রুপি (এলকেআর) বা ৭৭ পয়সা (শ্রীলঙ্কান টি বোর্ড)।
বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) গবেষণা বলছে, গত ১০ বছরে চায়ের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৭৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০১৬ সালে উৎপাদিত চা বিক্রিতে যেখানে কেজিপ্রতি গড় মুনাফা ছিল ৪৮ টাকা ৫২ পয়সা, সেখানে ২০২৬ সালে এসে লোকসান গুনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি গড়ে ২৩ টাকা ১০ পয়সা।
বাগান মালিকরা জানান, চা প্রক্রিয়াজাতকরণে অত্যাবশ্যকীয় ডিজেলের দামবৃদ্ধি, বাগান পরিচর্যা ও বাগানসৃজন, কীটনাশক ও সারের বর্ধিত মূল্য, ব্যাংকঋণের সুদ ও শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাগান মালিকদের ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। চা বাগানের ঐতিহ্য ও জৌলুস কোনোটাই এখন নেই। চা চাষে উত্তরাধিকার সূত্রে বাগানের মালিকানা পাওয়া অনেকেই এখন আর এ ব্যবসায় থাকতে চান না। সরকার যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ দিলে অনেকেই এ ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে চান।
১৯৭০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে তখনকার ৩০ মিলিয়ন ডলারের চা শিল্পের বর্তমান বাজারমূল্য ৩৫০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এক সময়ে দেশে উৎপাদিত চা অন্যতম অর্থকরী ফসল হিসেবে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হলেও এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনেক বেড়েছে। বাগানের সংখ্যা ও উৎপাদন বেড়েছে। দেশের চা অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করছে।
চা শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্য, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনের বিপুল কর্মসংস্থান, চা শ্রমিকদের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন এবং আগামী দিনের বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রয়মূল্য বাড়েনি।
ফলে অনেক বাগান মালিক বার্ষিক আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সংকুলান করতে না পেরে রুগ্ন হয়ে পড়েছেন। অনেকে আবার ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হয়েছেন।
চা উৎপাদকদের এ সংকটাবস্থা থেকে বাঁচাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে নিলামে ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্য কেজিপ্রতি ২৪৫ টাকা করা হয়। তাতে চা উৎপাদকরা সামান্য উপকৃত হয়েছেন বটে কিন্তু লোকসানের হাত থেকে রেহাই পাননি। বিটিএ জানায়, ব্যবস্থাপনা ব্যয়সহ বর্তমানে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় হয় সর্বনিম্ন ২৭০ টাকা। নিলামে চা বিক্রি করলে কেজিপ্রতি লোকসান হচ্ছে ২৫ টাকা। বাংলাদেশ চা বোর্ডের (বিটিবি) বিপণন শাখা জানিয়েছে, নিলামে স্ট্যান্ডার্ড সেইল ভ্যালুয়েশন বা আদর্শ মূল্য নির্ধারণ করে দিয়ে তার ওপর বিডিং বা নিলাম ডাকা হয়। প্রকৃত বিক্রয়মূল্য এর কম বা বেশি হতে পারে। নিলামে এ যাবত সর্বোচ্চ দর উঠেছে (সর্বোচ্চ ভালো মানের) কেজিপ্রতি ৩১০ টাকা, যা খুবই কম। তবে ফ্লোর প্রাইসের নিচে এখন আর চা বিক্রি হচ্ছে না। সে বিবেচনায় বাগান মালিকদের কিছুটা আর্থিক লাভ হয়েছে।
বিটিএ চেয়ারম্যান ও কাপনা টি এস্টেটের স্বত্বাধিকারী কামরান টি রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, “আমরা যারা চা বাগানের ঐতিহ্য ধরে রেখেছি, তারা সবাই লোকসান গুনছি। আমাদের সবাই ‘বড়লোক’ হিসেবে জানে। সবাই জানে আমরা শ্রমিক ঠকাই। তাই আমাদের দুঃখের কথা কেউ শুনতে চায় না, বুঝতেও চায় না। অথচ প্রকৃত চিত্র ঠিক উল্টো। চা বিক্রি করে আমরা ঠকছি।”
তিনি বলেন, ‘এ বাস্তবতায়ও শ্রমিকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের আগস্ট থেকে মজুরি আবারও ৫ শতাংশ হারে বাড়াতে হচ্ছে আমাদের। বর্ধিত বেতন কার্যকরী হলে প্রত্যেক শ্রমিক দৈনিক নগদ মজুরি পাবে ৩৭৭ টাকা। জুলাই পর্যন্ত তাদের দৈনিক মজুরির পরিমাণ ৩৬০ টাকা ৫৭ পয়সা।’
বিটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘বর্তমানে একজন চা শ্রমিক নগদ মজুরির সঙ্গে অনগদ সুবিধা মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজার ৭৭২ টাকা প্রতি মাসে পায়। অনগদ সুবিধার মধ্যে রয়েছে প্রাণিসম্পদ পালন ও সবজি আবাদের জমিসহ বসতবাড়ি, চিকিৎসা, ভবিষ্যৎ তহবিলে মালিকের অনুদান, শিক্ষা, পেনশন ও নিরাপত্তা। প্রত্যেক শ্রমিক পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দুজনই বাগানে কাজ করেন। এ হিসাবে শ্রমিক পরিবারের আয় এখন আর নিম্ন পর্যায়ে নেই।’
কামরান টি রহমান বলেন, ‘আমরা চা চাষ করি, কিন্তু কৃষিঋণের হারে সুদের সুবিধা পাই না। শিল্পঋণের মতো ১৩ শতাংশের ওপরে সুদ দিতে হয়। চা শিল্পে প্রতি বছর এক হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো ঋণ বিতরণ করা হয়। এ বিপুল ঋণের উচ্চ সুদ উৎপাদন ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার কারণেও আমাদের লোকসানের পরিমাণ বাড়ে।’
দেশ রূপান্তর পত্রিকার এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, এনডিসি, চা শিল্পের বিদ্যমান সংকট ও বাগান মালিকদের লোকসান সম্পর্কিত বাস্তবতা স্বীকার করে বলেন, ‘চা বিক্রি করে অনেক বাগান মালিক শ্রমিকের মজুরি দিতে পারছে না; ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হয়ে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাগান মালিকদের বাঁচাতে চায়ের বিক্রয়মূল্য বাড়ানো প্রয়োজন। ফ্লোর প্রাইস উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সময় এসেছে। এটিকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রিভিউ করা দরকার। বাগান মালিকরা বাঁচলে এ শিল্প বাঁচবে। চা শিল্পের শ্রমিক পরিবার থেকে শুরু করে সবাই বাঁচবে।’
