রিজিক শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের অধিকাংশের মনে ভেসে ওঠে অর্থ-সম্পদ, চাকরি কিংবা জীবিকার কথা। ইসলামের দৃষ্টিতে রিজিকের ধারণা এত সংকীর্ণ নয়। মানুষের অস্তিত্ব, জীবনযাপন ও কল্যাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি অনুগ্রহই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। সুস্থ দেহ, প্রশান্ত মন, ইমান, জ্ঞান, সময়, পরিবার, প্রজ্ঞা, উত্তম চরিত্রও মহান আল্লাহর অমূল্য রিজিক। অর্থ-সম্পদ তার একটি অংশ মাত্র।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নয়।’ (সুরা হুদ ৬) অন্যত্র তিনি ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহই সর্বোত্তম রিজিকদাতা, তিনি মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী।’ (সুরা জারিয়াত ৫৮) এই আয়াতগুলো আমাদের শেখায়, রিজিক মহান রবের নির্ধারিত অনুগ্রহ, যা তিনি নিজ হেকমত অনুযায়ী তার বান্দাদের মধ্যে বণ্টন করেন।
ইসলামি পরিভাষায় রিজিক বলতে এমন সব বৈধ নেয়ামতকে বোঝায়, যার মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয় এবং জীবন পরিচালনার শক্তি লাভ করে। আলেমরা উল্লেখ করেছেন, যে বিষয় মানুষের উপকার সাধন করে কিংবা সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, সেটিও রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। তাই খাদ্য, পানি, বাতাস, আলো, বাসস্থান, পোশাক, সন্তান, অর্থ-সম্পদ, শারীরিক শক্তি কিংবা বৃষ্টিপাত যেমন দৃশ্যমান রিজিক, তেমনি হেদায়েত, ইমান, দ্বীনের জ্ঞান, আত্মিক প্রশান্তি, তাওয়াক্কুল, ধৈর্য, প্রজ্ঞা, সময়ের বরকত, উত্তম বন্ধু, সৎ পরিবার এবং নেক আমলের তৌফিকও আল্লাহর বিশেষ রিজিক।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা প্রায়ই রিজিককে কেবল অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত করি। ফলে অন্যের সম্পদ দেখে হীনমন্যতায় ভুগি, নিজের প্রাপ্ত নেয়ামতগুলোকে অবহেলা করি। অথচ যে ব্যক্তি সুস্থ শরীর নিয়ে ঘুম থেকে ওঠে, নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, পরিবারকে পাশে পায়, ইবাদতের তৌফিক লাভ করে কিংবা মানুষের উপকার করার সুযোগ পায়, সে প্রতিদিন অসংখ্য রিজিকের মধ্যে জীবনযাপন করছে। কিন্তু এসবের জন্য কজনই বা আন্তরিকভাবে শুকরিয়া আদায় করি?
কোরআনে মুত্তাকিদের পরিচয় দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকেই তারা ব্যয় করে।’ (সুরা বাকারা ৩) এখানে ব্যয় বলতে কেবল অর্থ দানকেই বোঝানো হয়নি। বরং আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নেয়ামত তার সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করাই বোঝানো হয়েছে।
আল্লাহ আমাদের প্রতিদিন চব্বিশ ঘণ্টা সময় দান করেন। সেই সময়ের একটি অংশ নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জ্ঞানার্জন কিংবা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করাও রিজিক থেকে ব্যয় করা। একইভাবে পরিবারের হালাল ভরণপোষণের জন্য পরিশ্রম, নিজের মেধা দিয়ে সমাজকে উপকৃত করা, কাউকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া কিংবা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও আল্লাহর দেওয়া শক্তি ও সামর্থ্যরে যথাযথ ব্যবহার। যাকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তার জন্য সেই জ্ঞান মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো, যাকে প্রভাব-প্রতিপত্তি দেওয়া হয়েছে, তার জন্য ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তা ব্যবহার করা এবং যাকে আত্মীয়স্বজনের নেয়ামত দেওয়া হয়েছে, তার জন্য আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাও আল্লাহর দেওয়া রিজিকের যথার্থ মূল্যায়ন।
রিজিক সম্পর্কে ইসলামের এই বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের অন্তরে এক অনন্য মানসিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে। তখন সে বুঝতে শেখে, মানুষের প্রকৃত সম্পদ শুধু ব্যাংক-ব্যালেন্স নয়, বরং সুস্থতা, ইমান, সময়, জ্ঞান, পরিবার, উত্তম চরিত্র এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ফলে লোভ, ঈর্ষা ও অকারণ হতাশা অনেকাংশে দূর হয়ে যায় এবং তার স্থলে জন্ম নেয় কৃতজ্ঞতা, সন্তুষ্টি ও তাওয়াক্কুল।
মুমিনের জীবনে রিজিকের প্রকৃত দর্শন হলো, হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং তার দেওয়া প্রতিটি নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
