চিত্রা নদীর পাড়ে জন্ম নেওয়া ‘লাল মিয়া’ একদিন রঙ-তুলির আঁচড়ে বাংলার কৃষক, মাটি ও মানুষের অন্তর্গত শক্তিকে তুলে ধরে হয়েছিলেন বিশ্ববরেণ্য শিল্পী এস এম সুলতান। ক্যানভাসে তার পেশি বহুল কৃষক যেন বাংলার মাটি ও মানুষের অদম্য শক্তিরই প্রতিচ্ছবি। আজ তার ১০৩তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে নড়াইলে শ্রদ্ধা আর স্মরণে ফিরে আসবে সেই কিংবদন্তির কথা। তবে শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত সংগ্রহশালাটি এখনো রয়েছে সীমাবদ্ধ পরিসরে। সুলতানের স্মৃতি ও শিল্পকর্ম ঘিরে এটিকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন তা কতদূর সে প্রশ্নও আজ সামনে আসবে।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর শিল্পী সুলতানের মৃত্যুর পর তার স্মৃতি সংরক্ষণে ২০০৩ সালে প্রায় এক একর জমির ওপর স্মৃতি সংগ্রহশালা ও শিশুস্বর্গ তৈরি করা হয়। এ ছাড়া শিল্পীর নামে একটি আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় রয়েছে শিল্পীর আঁকা দুর্লভ কিছু ছবি ও তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র। সংগ্রহশালায় বর্তমানে শিল্পী সুলতানের ২৩টি দুর্ভল চিত্রকর্ম এবং ৫৩টি রেপ্লিকা রয়েছে। শিল্পীর আরও চিত্রকর্ম থাকলেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রদর্শন করা যাচ্ছে না।
মাত্র প্রায় এক খন্ড জমির ওপর স্থাপনা দেখে ঘুরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত দর্শনার্থীরা পরিপূর্ণ আত্মতৃপ্তি পান না। সম্প্রতি কথা হয় রাজধানী ঢাকার মিরপুর থেকে আসা কলেজছাত্রী হাসিবা ইসলামের সঙ্গে। তিনি পরিবারের সঙ্গে নড়াইলে বেড়াতে এসেছেন। সেই সূত্রে ঘুরতে এসেছিলেন সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায়। শিল্পীর ছবিগুলো দেখে ভালো লেগেছে। তবে জায়গা কম হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমা তার বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায়। তিনি এসএম সুলতানের নৌকাটিকে (ভাসমান শিশুস্বর্গ) মেরামত করে নদীতে ভাসানোর দাবি জানান।
এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জি জানান, ‘পদ্মা সেতু ও মধুমতি সেতু চালুর পর এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় দর্শনার্থী বেড়েছে। বর্তমানে শিল্পী সুলতানের মাত্র কয়েকটি ছবি প্রদর্শনীতে রয়েছে। শিল্পীর আরও চিত্রকর্ম থাকলেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। সংগ্রহশালাটিকে পর্যটন বান্ধব করতে জমি অধিগ্রহণসহ কিছু স্থাপনা নির্মাণের জন্য এটি প্রকল্প মন্ত্রণালয় পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে সংগ্রহশালার পরিধি বাড়বে এবং এটি একটি পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নেবে। ’
জানা যায়, সংগ্রহশালাটি সম্প্রসারণের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ২০২৪ সালের দিকে। জমি অধিগ্রহণসহ প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ওই প্রকল্প প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে জমা আছে।
কিউরেটর আরও জানান, সুলতান শিশুদের জন্য একটি নৌকা তৈরি করেছিলেন। সেই নৌকাটির একটি রেপ্লিকা তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। রেপ্লিকাটি তৈরি করা গেলে আগের মতো শিশু শিক্ষার্থীরা নৌকায় ভেসে ভেসে মনের আনন্দে ছবি আঁকতে পারবে। পাশাপাশি দর্শনার্থীরাও ইচ্ছা করলে নৌকাটি ব্যবহার করে বিনোদনের সুযোগ পাবে।’
চলছে শিশুস্বর্গ : শিশুস্বর্গে বর্তমানে সপ্তাহে দুদিন শিশুরা ছবি আঁকা শেখেন। কোমলমতি এসব শিশুশিল্পী এসএম সুলতানের মতো চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছবি আঁকা শিখছে। শিশু শিক্ষার্থী অজিহা কবির জানায়, সে সপ্তাহে দুদিন আর্ট শিখতে আসে। প্রাকৃতিক দৃশ্য, নদী, খাল, বিল, এসএম সুলতান, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, জুলাই যোদ্ধাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপরে ছবি আঁকা শিখেছে। বড় হয়ে এসএম সুলতানের মতো শিল্পী হতে চায়।
জীবন-কর্ম : বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের (শেখ মোহাম্মদ সুলতান) জন্ম ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে। বাবা পেশায় ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রি ও কৃষক। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় বেশি দূর এগোতে পারেননি সুলতান। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পর তার স্কুলজীবনের ইতি ঘটে। এরপর তিনি বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। তবে ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ করার পাশাপাশি তিনি দালানকোঠার ছবি আঁকা শুরু করেন।
১৯৩৮ সালে তিনি কলকাতার আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়ে প্রায় তিন বছর চিত্রকলার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই তিনি বেরিয়ে পড়েন। শিল্পী সুলতান পাকিস্তান, কাশ্মীর ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। ভ্রমণ ও সাধনার মাধ্যমে নিজেকে একজন বিশ্বমানের চিত্রশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলেন।
জীবদ্দশায় কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ছবি প্রদর্শনী বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে তিনি এসব দেশে বেশ কয়েকটি একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নেন। দেশের ভেতরে ঢাকা ও নড়াইলে তার বিখ্যাত চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে এবং ১৯৮৭ সালে গ্যেটে ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীগুলো তার খ্যাতি ছড়িয়ে দেয়।
সুলতানের চিত্রকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রামীণ জীবন ও অতিবলিষ্ঠ পেশিবহুল কৃষক সমাজ। তার বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে চরদখল, ধানকাটা, পাটকাটা, কৃষকের সংগ্রাম ও আমার গ্রাম, উল্লেখযোগ্য।
চিত্রশিল্পে অনন্য ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে এসএম সুলতানকে ১৯৮২ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
১০ অক্টোবর ১৯৯৪ শিল্পী সুলতান অনন্তের পথে যাত্রা করেন। জন্মস্থান মাছিমদিয়ায় তাকে সমাহিত করা হয়।
১০৩তম জন্মবার্ষিকীর কর্মসূচি : শিল্পী সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কোরআন খতম, শিল্পীর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি, শিশুকিশোরদের চিত্রাঙ্কন উৎসব, আর্টক্যাম্প, চিত্রপ্রদর্শনীর উদ্বোধন, আলোচনা সভা ও এসএম সুলতান সম্মাননা পদক বিতরণ।
এ বছর সুলতান সম্মাননা পদক পাচ্ছেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, প্রিন্টমেকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ ছাড়া থাকবেন বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম এমপি, আতাউর রহমান এমপি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন, সচিব জাকির হোসেন প্রমুখ।
