তরুণ তাহমিদুল ইসলাম ইবনুল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (সিডিএ) ইমারত পরিদর্শক হিসেবে গত ২২ ফেব্রুয়ারি যোগদান করেন। গত ৩০ এপ্রিল চা বোর্ডে সার্ভেয়ার পদে নিয়োগ পান তিনি। তবে সিডিএর চাকরি ছেড়ে তিনি চা বোর্ডে যোগদান করেননি। গতকাল রবিবার সিডিএর সচিব মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এমন অব্যাহতি শুধু ইবনুলের ক্ষেত্রেই নয়, আরও সাতজনসহ মোট আটজনকে সিডিএ হঠাৎ করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। তরুণসহ এই আটজন ইমারত পরিদর্শক গত ২২ ফেব্রুয়ারি যোগদান করেছিলেন।
নিয়োগপত্রের শর্তানুযায়ী, যথাযথ শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা এবং তাদের যোগদানপত্র গৃহীত না হওয়ায় চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে নিয়োগপত্রের শর্তানুযায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলে তাদের আবেদন গ্রহণ করা হলো কীভাবে?
গত বছরের ২১ অক্টোবর সিডিএ ৩১টি পদে লোক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তির ১৭ নম্বর ক্রমে ছিল ইমারত পরিদর্শক পদ ১৮ জন লোক নিয়োগের কথা। আবেদনকৃত প্রার্থীদের আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিডিএ ৩৬৪ জনকে লিখিত পরীক্ষার জন্য মনোনীত করে। ১৭ জানুয়ারির লিখিত পরীক্ষায় ১৮ জনকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করে ২৫ জানুয়ারি মৌখিক পরীক্ষার জন্য উপস্থিত থাকতে বলা হয়। মৌখিক পরীক্ষা শেষে ১৮ জনকে চূড়ান্ত উত্তীর্ণ ঘোষণা করে ২৫ জানুয়ারি ফল প্রকাশ করা হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি নিয়োগপত্র ইস্যু করে তাদের ২২ ফেব্রুয়ারি যোগদান করতে বলা হয়। সে অনুযায়ী তারা যোগদান করেন। সিডিএর তৎকালীন সচিব ২৩ ফেব্রুয়ারি তা গ্রহণ করেন। পরে ৩ মার্চ তাদের সংস্থাপন শাখায় যোগদান দেখিয়ে অফিস আদেশ ইস্যু করেন সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল। ৯ মার্চ সিডিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান এজিএম সেলিম এ পরিদর্শকদের অথরাইজেশন-১ ও অথরাইজেশন-২ বিভাগে পদায়ন করেন। সেই থেকে তারা গতকাল রবিবার পর্যন্ত কাজ করে আসছেন।
অযোগ্যতার কারণ জানতে গতকাল দুপুরে সিডিএর সদস্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নূরীর কার্যালয়ে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তিনি বলেন, পত্রিকায় প্রকাশিত শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে তাদের যোগ্যতার মিল নেই। তাই তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অযোগ্যতা থাকলে বাছাই কমিটি তাদের দরখাস্ত বাদ দেয়নি কেন? জবাবে তিনি বলেন, এটা বাছাই কমিটি ভুল করেছে। বাছাই কমিটি যদি এ বিষয়ে লিখিত ফুটনোট দিত তাহলে আজকে অব্যাহতির প্রশ্ন আসত না। শুরুতেই এসব দরখাস্ত বাতিল হয়ে যেত।
বাছাই কমিটির পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর তাদের নামে যোগদানপত্র ইস্যু করা হলো। এতদিন পর কেন তাদের অব্যাহতি দিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল্লাহ নূরী বলেন, দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ঠিকই আছে। কিন্তু সারা দেশের সব সংস্থা প্রবিধানমালা পরিবর্তন করে পরিবর্তিত শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করলেও সিডিএ তাদের প্রবিধানমালায় এ পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সংশোধন করেনি। এর দায় সিডিএর। আবার প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের রাখাও যাচ্ছে না। সে জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলাম।
মন্ত্রণালয় থেকে কী জবাব এসেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় বলেছে প্রবিধানমালা সংশোধন করে চিঠি দেওয়ার জন্য। আমরা সিডিএর পুরো প্রবিধানমালা সংশোধনের জন্য চিঠি দিয়েছি।
এ বিষয়ে জানতে কথা হয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (প্রশাসন-৪) আম্বিয়া সুলতানার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আট ইমারত পরিদর্শকের বিষয়টি আমরা জানি। আমরা বলেছি, শুধু একটি পদের জন্য প্রবিধানমালা না করে সিডিএর পুরো প্রবিধানমালা সংশোধনের চিঠি পাঠানোর জন্য। সিডিএ চিঠি পাঠিয়েছে এবং বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। ইতিমধ্যে সরকারের অন্যান্য সংস্থা তাদের প্রবিধানমালায় এ পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সংশোধন করেছে। তাই এটা সংশোধন হয়ে গেলেই হয়ে যায়। তারপরও সিডিএ যেহেতু অব্যাহতি দিয়েছে, তাই চিঠি পেলে আমরা সঠিকভাবে বিষয়টি জানতে পারব।’
নিয়ম মেনেই নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে : সিডিএর ইস্যুতে সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) আবদুল মতিন। তিনি বলেন, ‘সিডিএর বিষয়টি পুরোপুরি জানি না। তাই সরাসরি মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’ যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে বাছাই কমিটি, লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষার পর নিয়োগপত্র ইস্যু করা হলে তা কি সঠিক? আবদুল মতিন বলেন, ‘যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে যখন নিয়োগপত্র দেওয়া হয় তা চূড়ান্ত বিবেচনা করেই দেওয়া হয়ে থাকে।’
শিক্ষাগত অযোগ্যতা : প্রবিধানমালা অনুযায়ী ইমারত পরিদর্শক পদে উচ্চমাধ্যমিক পাস এবং সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায় পাস হতে হবে। এই আটজন এসএসসি পাসের পর উচ্চ মাধ্যমিক পাস না করে সার্ভে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে পাস করেছেন। এদেরই একজন ইজতিহাদ ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা যেহেতু এসএসসি পাসের পর চার বছরের ডিপ্লোমা-ইন সার্ভে কোর্স থেকে পাস করেছি, তাই কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে আমাদের এই পাসকে এইচএসসি পাসের সমমান বিবেচনা করা হয়। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে আনা সমমানের সেই সনদ সিডিএতে জমাও দিয়েছি। এ ছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও সমমান বলা হয়েছিল। তাই আমাদের অবৈধ বলার কোনো সুযোগ নেই।’
এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ সার্ভে ইনস্টিটিউট কুমিল্লার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মোবারক হোসেনের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিডিএর প্রবিধানমালায় ইমারত পরিদর্শক পদে সার্ভে ফাইনাল কোর্সের যে যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে, তা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন আর নেই। ২০০৫ সালে এই কোর্স বন্ধ হয়ে যায় এবং যারা অনিয়মিত ছিল তাদের জন্য ২০১০-২০১২ সালে চালু ছিল। বর্তমানে দেশে চার বছরের ডিপ্লোমা-ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (সার্ভে) কোর্স চলমান রয়েছে। সিডিএ যেই শিক্ষাগত যোগ্যতা চেয়েছে, এসব শিক্ষার্থীর এর চেয়ে বেশি যোগ্যতা রয়েছে। সার্ভে ফাইনাল হলো দুই বছরের কোর্স, আর ডিপ্লোমা-ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (সার্ভে) হলো চার বছরের কোর্স। আর এটি এইচএসসি পাসের সমমান। দেশের সব সংস্থায় বর্তমানে সার্ভেয়ার ও ইমারত পরিদর্শকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ডিপ্লোমা-ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (সার্ভে)। সিডিএ তাদের প্রবিধানমালা পরিবর্তন করেনি, এটি তাদের ব্যর্থতা।
এই ৮ জন ৫ মাস বেতনও পাননি : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সার্ভেয়ার পদের চাকরি ছেড়ে সিডিএতে ইমারত পরিদর্শক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ইজতিহাদ ইসলাম খান। পায়রা বন্দরে সার্ভেয়ার পদে নিয়োগ পাওয়ার পরও সেখানে যোগদান করেননি শরিফুল ইসলাম ও অনয় সিংহ সুজাত। ইজতিহাদ ইসলাম বলেন, গত ৫ মাস ধরে চাকরি করেছি। একসঙ্গে যোগ দেওয়া অন্যরা বেতন পেলেও আমরা আটজন পাচ্ছি না। আমাদের প্রতি অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে। বেতনের জন্য সিডিএর সচিব বরাবর লিখিত আবেদন করেছি।
বেতন না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএর সদস্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নূরী বলেন, যেহেতু তাদের নিয়োগ নিয়ে শুরু থেকে ঝামেলা ছিল, তাই ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্ট বেতন ছাড় করেনি।
