হাসিনার দ্রুত প্রত্যর্পণ চায় বাংলাদেশ

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৫ এএম

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যাকান্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ফেরত দিতে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। 

নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে গতকাল সোমবার আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এ সাক্ষাতের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, দ-প্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বলা হয়েছে। সরকার আশা করে, ভারত এ ব্যাপারটি ইতিবাচক দিকে এগিয়ে নেবে। এ ছাড়া, শহীদ হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীরা ভারতে ধরা পড়েছে। সরকারের জন্য এটা (হাদি ইস্যু) অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তাই হত্যাকারীদের যত দ্রুত সম্ভব প্রত্যর্পণ করতেও বলা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে তিনি সেদিনই ভারতে যান। গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকার একটি আদালত তাকে মৃত্যুদ- দেয়। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে কয়েক দফা পত্র দিয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন টানাপড়েন শুরু হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করার পর ভারতের বিজেপি সরকার গত ৫৪ বছর ধরে অনুসৃত রীতির বাইরে গিয়ে পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে দলের প্রবীণ নেতা দীনেশ ত্রিবেদী হাইকমিশনার নিযুক্ত করে। গত ১২ জুন হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ত্রিবেদীকে প্রথমবার গতকাল প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ দেন। রাজধানীর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আলাপে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে সহায়ক পরিবেশ দরকার, সেই ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অডিওকলে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন। ভারত সরকারের প্রশ্রয়ে শেখ হাসিনা এমনটি করার সুযোগ পেয়েছেন, এমন অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ সরকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনায় এ বিষয়গুলো এসেছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ‘গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন’, এটা হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন।

ভারত দুঃখ প্রকাশ করেছে কি না, একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, এখানে দুঃখ প্রকাশের ব্যাপার নয়। বুঝতে হবে, কী হয়েছে। একটা রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ থাকে নির্বাহী, আইন প্রণয়ন ও বিচার বিভাগ। দ-প্রাপ্ত হওয়ায় শেখ হাসিনার জায়গা হলো বিচার বিভাগ। বাংলাদেশের একটি আদালত তার বিচার করেছে, তাকে দ- দিয়েছে। দ-প্রাপ্ত ব্যক্তির বিষয়ে কী হয়? তাকে হেফাজতে নেওয়া হয় এবং তার যদি কিছু বক্তব্য থাকে, আত্মপক্ষ সমর্থনের কিছু থাকলে, সেটা আদালতে বলবেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভ বিচার বিভাগের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন এবং সেই কাজটি ভারত সরকার করতে দিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তার (খলিলুর রহমান) সঙ্গে হাইকমিশনারের রবিবারের সাক্ষাতে বলা হয়েছে সরকার চায়, বাংলাদেশের পুরো রাষ্ট্র-কাঠামোর প্রতি সব দেশ শ্রদ্ধাশীল হোক এবং সরকার আশা করে, ভারত সরকার বিষয়টি অনুধাবন করতে পারবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে হেয় করার মতো কিছু তারা আর করবে না, এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।

এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ করা হয়নি, এটি জানিয়ে তিনি বলেন, দাওয়াত দেওয়া হয়েছে বিমসটেক চেয়ারপারসন হিসেবে। এর আগে সরকার গঠনের দিন প্রধানমন্ত্রীকে (তারেক রহমান) ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একটি চিঠি হস্তান্তর করা হয়েছে। চিঠিতে তারিখ ছাড়া যে আমন্ত্রণের কথা বলা আছে সেটা সরকার ‘কোনো একসময়ে’ দেখবে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন নিয়ে আলোচনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, খুব সংক্ষেপে আলোচনা হয়েছে।

হাইকমিশনার ত্রিবেদী ঢাকায় তার প্রথম দুই মাসের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে জানান। সাংবাদিকদের ত্রিবেদী বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সফরের আমন্ত্রণ আগে থেকে দেওয়া আছে। ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ সফরের জন্য অপেক্ষায় আছেন।

দুই দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত ইস্যুগুলো প্রসঙ্গে ত্রিবেদী বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ইস্যুতো থাকবেই। বাংলাদেশের ইস্যু, ভারতের ইস্যু এগুলো থাকবেই। তবে জনগণের ইস্যু হলো ভালো সম্পর্ক। ভালো সম্পর্কে উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক (উইন-উইন)।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক এমনটি উল্লেখ করে হাইকমিশনার যোগ করেন, ‘প্রতিবেশীতো বদলানো যায় না। আমরা কেবল সীমান্তের অংশীদার নই; স্বপ্নেরও অংশীদার।’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে হাইকমিশনার গতকাল সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেন।    

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকমিশনারকে বলেন, ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটসহ নানাদিক থেকে দুই দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাই অতীতকে পেছনে ফেলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে একটি নতুন সূচনা (ফ্রেশ স্টার্ট) করা জরুরি। 

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দুই দেশের মধ্যে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য আছে, যেগুলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। সমতার ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। এ বিষয়ে ভারতকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত