আগুন নিয়ন্ত্রণে ৪৮ হাজার কর্মী

এল নিনোর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়াজুড়ে ভয়াবহ দাবানল

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫২ এএম

ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। অস্বাভাবিক শুষ্ক মৌসুম এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো পরিস্থিতিকে আগুনের ঝুঁকি বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা। দাবানল নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৫০ হাজার অগ্নিনির্বাপক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী এবং কয়েক ডজন হেলিকপ্টার কাজ করছে।

পূর্ব জাভা প্রদেশের ব্রোমো টেংগার সেমেরু ন্যাশনাল পার্কে সবচেয়ে বড় আগুনের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, সেখানে প্রায় ৭৪৩ হেক্টর (১ হাজার ৮৩৬ একর) এলাকা পুড়ে গেছে। পরিস্থিতির কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পার্কটি পর্যটকদের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দর্শনার্থী, কর্মী এবং আশপাশের এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগুনে বিস্তীর্ণ শুষ্ক তৃণভূমি, বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং সংরক্ষিত এডেলওয়েইস ফুলের বড় অংশ পুড়ে গেছে। আগুন জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র পেনানজাকান এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এটি মাউন্ট ব্রোমোর আগ্নেয়গিরির দৃশ্য দেখার জন্য পর্যটকদের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় স্থান। তবে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা ভবন খালি করার খবর পাওয়া যায়নি।

এদিকে সুমাত্রা দ্বীপের জাম্বি প্রদেশে দাবানল মোকাবিলায় প্রায় ৬ হাজার অগ্নিনির্বাপক মোতায়েন করা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, গভীর পিটমাটি, পানির সীমিত সরবরাহ, দুর্গম এলাকা এবং প্রবল বাতাস আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনটি অগ্নিনির্বাপক হেলিকপ্টারও সেখানে কাজ করছে।

এল নিনোর প্রভাবে বাড়ছে আগুনের ঝুঁকি

ইন্দোনেশিয়ার বন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুষ্ক আবহাওয়া এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো পরিস্থিতির কারণে চলতি শুষ্ক মৌসুমে দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা বিএমকেজি সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালের শুষ্ক মৌসুম স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এর ফলে খরা ও দাবানলের আশঙ্কাও বাড়ছে।

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যার ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটে। সাধারণত ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর প্রভাবে অপেক্ষাকৃত শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হয়। সর্বশেষ এল নিনোর প্রভাবে ২০২৩ ও ২০২৪ সাল বৈশ্বিকভাবে রেকর্ড উষ্ণতম বছর হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

ইন্দোনেশিয়ার বন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশটিতে ১ লাখ ৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমি আগুনে পুড়েছে। ২০২৩ সালের পুরো বছরে যে পরিমাণ এলাকা পুড়েছিল, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই তার দ্বিগুণের বেশি এলাকা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর হবে দাবানলের ঝুঁকির দিক থেকে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময়।

মেঘ তৈরির উদ্যোগেও বাধা

দাবানল নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটাতে ক্লাউড সিডিং বা মেঘে লবণকণা ছড়িয়ে বৃষ্টিপাত ঘটানোর উদ্যোগকে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বর্তমানে ক্লাউড সিডিং পরিচালনার উপযোগী বৃষ্টিবাহী মেঘ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সরকারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী জামারি চিয়ানিয়াগো।

ফলে ক্লাউড সিডিংয়ের পরিবর্তে পানিবাহী উড়োজাহাজের মাধ্যমে পানি ছিটানো এবং স্থলভিত্তিক অগ্নিনির্বাপক দলের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বনমন্ত্রী রাজা জুলি আন্তোনি। রবিবার মাউন্ট ব্রোমো পরিদর্শনের সময় তিনি নতুন করে আগুনের সূত্রপাত ঘটাতে পারে—এমন কর্মকাণ্ড থেকে জনগণকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। বিশেষ করে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফেলে দেওয়া এবং জমি পরিষ্কারের জন্য আগুন ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন তিনি।

কয়েকটি অঞ্চলে জরুরি পরিস্থিতি

ইন্দোনেশিয়ার আগুনপ্রবণ কয়েকটি অঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। সুমাত্রা দ্বীপের রিয়াউ, জাম্বি ও দক্ষিণ সুমাত্রা প্রদেশে প্রায় ৪৮ হাজার ৮৯০ হেক্টর পিটভূমি আগুনে পুড়ছে। বোর্নিও দ্বীপের মধ্য কালিমান্তান ও দক্ষিণ কালিমান্তানেও দাবানল দেখা দিয়েছে।

দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি মোকাবিলায় আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষগুলো ৪৮ হাজারের বেশি অগ্নিনির্বাপক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী মোতায়েন করেছে। দুর্গম এলাকা, পানির সংকট ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে অভিযান অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।

 

 

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত