নির্জন সমুদ্রতটে আমি

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৪ এএম

সাগরের নীল জলরাশির মধ্যে ফুঁড়ে ওঠা সবুজ স্বর্গভূমি। নাম কো টাও (কড়য ঞধড়) দ্বীপ। বাংলা অর্থ কচ্ছপের দ্বীপ। এখানে অনেক কচ্ছপ আছে। দ্বীপটি মাঝারি আকৃতির পাহাড় দিয়ে ঘেরা। পাহাড়গুলো আবার ঘন সবুজ গাছগাছালি, লতাগুল্ম দিয়ে আবৃত। দূর থেকে সীমাহীন নীল জলরাশির মাঝে এক টুকরো সবুজ। দ্বীপের চারপাশে সাদা বালুর সৈকত। এই বালি গায়ে মাখলে, শরীর ময়লা হয় না। সঙ্গে সঙ্গে ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ে।

বিচের উপর দিকটায় নারিকেল গাছ। সব শৈল্পিক গুণ বজায় রেখে হেলে পড়েছে সাগরের ওপর। পানি স্বচ্ছ আর নীলাভ। প্রায় ত্রিশ মিটার পর্যন্ত খালি চোখে দেখা যায়। রঙিন মাছ, কচ্ছপ, ছোট তিমি। সহজেই দেখা যায়। বিভিন্ন দেশের তরুণ-তরুণীরা এখানে ভিড় জমায়।

এক বিকেলে নারিকেল গাছের সারির পাশ দিয়ে আমি স্লিপার পরে হাঁটছি। পাশে সাগর রয়েছে দৃষ্টিসীমায়। রোদ আরও মোলায়েম হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। বাতাসে নোনা সুবাস। ইট বিছানো রাস্তাটা ভারি সুন্দর। কফিশপ, পিজ্জা, বিয়ারের ঘ্রাণ।

ভ্রমণকারীরা কারও হাতে তরমুজ, কারও হাতে আনারসের জুস কিংবা ডাবের পানি পান করছে স্ট্র দিয়ে। দুপাশে সুভেনিরের দোকান। বাহারি জামাকাপড়, ছেলেমেয়েদের অলংকার, মাছ, কচ্ছপ, পাথর, ফুলের ডিজাইন।

আনন্দে আমার মন ভরে গেল। কমলা রঙের রোদ গালে এসে লাগছে। নারকেল পাতার শনশনানি।

এখানের সন্ধ্যা অপরিচিত, অতিপ্রাকৃত, অচেনা পৃথিবীর। নীল জলরাশির ওপর বেগুনি কমলা রঙ মেশানো আকাশ, ধীর ও দীর্ঘস্থায়ী সন্ধ্যা। দ্বীপের সন্ধ্যাগুলো আলাদা। বিকেল থেকে সন্ধ্যা তারপরে রাত এই পরিবর্তনগুলো চোখে লাগে না। অগোচরে এগিয়ে যায়। নীল পানি কমলা, ধীরে ধীরে লাল হতে থাকে। রক্তিম পানিতে জাহাজের কালো ছায়া। ঢেউগুলো যেন অনুঘটক।

দ্বীপের মধ্যে আঁকাবাঁকা মসৃণ রাস্তা। দুপাশে ফুলগাছ। হলুদ রঙের প্রাধান্য বেশি। পাপড়ি পড়ে আছে পথে পথে  সঙ্গে রসালো আম। কেউ তুলে নিয়ে যায় না। যেন আম এক অচ্ছুৎ ফল। দুপাশের বাড়িতে মানুষ ও তাদের পোষাপ্রাণী। কুকুরগুলো ভয় দেখাতে তেড়ে আসে কোনোটা আবার আদর নিতে। বিড়ালগুলো বাড়ির দেয়াল ঘেষে ঘুমায়। কেউ পাশ দিয়ে গেলে আলস্য নিয়ে চোখ মেলে। তারপর হাই তুলে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। এই পৃথিবীর রূপ, লাবণ্য তার কাছে কোনো দাম নেই যেন। মানুষদের খুব অপছন্দ। ঘুম তার অধিক প্রিয়। ঘুমই সুখ। এটাই মনে হলো।

 নোনা জল, সাদা বালি, কমলা রোদ, ডাবের পানি, তরমুজ, ড্রাগন ফল, প্যারট ফিশের রসুন মাখা ঝোল, বিয়ারের সুঘ্রাণ আর মেয়েদের পারফিউমের গন্ধ নোনা বাতাসে মিলেমিশে একাকার। এই বাতাস, এই নোনাজল, এই সাদা বালি গায়ে মাখলে দুঃখ দূর হয়, মাধুর্য বাড়ে। শিশুসুলভ মন আপনার বালি নিয়ে সাগর পাড়ে খেলতে ইচ্ছে করবে। প্রকৃতির কাছে আমারা সবাই শিশু। প্রকৃতি আমাদের মা। আমাদের আশ্রয়।

দুদিন, তিনদিন, চারদিন। আমার দিন কে গুনে। সময়কে এখানে কেউ বন্দি করে রাখে না। সময় এখানে মুক্ত।  আমার তাঁবু পাতা নারকেল গাছের নিচে। সাদা বালুর ওপর। গত কিছুদিন থেকে সাদা বালিই আমার বিছানা। সারা দিন এখানে ভোর রাতে সাগরের ঢেউয়ের তেজ বাড়ে। পানি আমার তাঁবু ছুঁইছুঁই করলে আমি ঘুম ঘুম চোখে উঠে আবার, নতুন করে তাঁবু সরাই। খানিকটা ওপরে।

তারপর সকালের বাতাসে তাঁবুর জানালা খুলে বসে দেখি সামনে দিগন্ত জোড়া জলরাশি, ঢেউয়ের লহরি, সাদা নৌকা, জাহাজের ধোঁয়া। আমি কোহেনের গান ছেড়ে দিলাম মোবাইলে। সমুদ্রের বাতাসে কোহেনের গান মিলিয়ে যাচ্ছে।

হ্যালেলুজাহ!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত