অন্যের আলোয় উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন লাকীর

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১১ এএম

নিজের দুই চোখে কোনো আলো নেই, কিন্তু ‘দেখার স্বপ্ন আছে অসীম। ব্রেইল পদ্ধতির বইয়ের অভাব, শ্রেণিকক্ষে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশের অনুপস্থিতি আর পদে পদে আর্থিক টানাপড়েন। এতসব ‘নেই’ এর ভিড়েও যা ছিল, তা হলো অদম্য একাগ্রতা। শত প্রতিকূলতার দেয়াল টপকে চলতি বছরের মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় ৩.৬১ জিপিএ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মেয়ে লাকী আকতার। তার এখনের স্বপ্ন, উচ্চশিক্ষা শেষে একদিন আদর্শ শিক্ষক হবেন।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোরী লাকী আকতার চট্টগ্রাম মহানগরীর হামজারবাগ এলাকার রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। ওই বিদ্যালয় থেকে চলতি বছর আট শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন, যাদের মধ্যে লাকীর মতো দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ছিলেন ৯ জন। কৃতকার্য হওয়া সাতজনের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল করেছেন লাকী। রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কয়েক কদম এগোলেই শাহজাহান হাউজিং সোসাইটি। সেখানে একটি সংগঠনের পরিচালিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের হোস্টেল ‘অপলা সুইট হোম’ এ থাকেন লাকী। সঙ্গে থাকেন চট্টগ্রাম কলেজপড়ুয়া তার বোন মরিয়ম আকতার। তিনিও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। গতকাল মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর দুপুরে ওই মেসে বসে কথা বলার সময়ে লাকীর চোখেমুখে ফুটে ওঠে জয়ের উচ্ছ্বাস।

তবে এই আনন্দের পেছনের পথটা একেবারেই মসৃণ ছিল না। লাকী বলেন, আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা শ্রুতিলেখকের জটিলতা। এই জটিলতায় গত বছর সব পরীক্ষায় বসতেই পারিনি। এবার যে শ্রুতিলেখক পেয়েছিলাম, সে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার জন্য নবম-দশমের পড়াগুলো একেবারেই নতুন। অনেক কষ্টে তাকে বোঝাতে হয়েছে। সে কতটুকু বুঝে লিখেছে জানি না। শ্রুতিলেখক সমসাময়িক কেউ হলে ফল হয়তো আরও ভালো হতো। তবুও যা পেয়েছি, তাতেই খুশি।

পদে পদে থাকা প্রতিবন্ধকতার কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে গলা ধরে আসে লাকীর। অশ্রুসজল কণ্ঠে বলেন, আমাদের পড়ার মতো যথেষ্ট ব্রেইল বই ছিল না। শিক্ষকরা সেভাবে গাইড করতেন না। শুনে শুনে যতটুকু পেরেছি, আয়ত্ত করেছি। আমি দু-একটি পুরনো ব্রেইল বই পেলেও অন্য অনেকে তাও পায়নি।

পরীক্ষার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষা আমাদের জন্য আতঙ্কের। কারণ পড়াশোনা নয়, শ্রুতিলেখক খুঁজতেই আমাদের নাভিশ্বাস উঠে যায়।

সব বাধা পেরিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা শুনিয়ে লাকী বলেন, ভবিষ্যতে আমি শিক্ষক হব। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়। আমি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবার সঙ্গে মিশে শিক্ষকতা করতে চাই। তার আগে উচ্চ শিক্ষা শেষ করতে চাই কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

লাকীর সাফল্যে গর্বিত তার শিক্ষকরাও। রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুর নাজমা আক্তার বলেন, পড়ালেখার প্রতি লাকীর রয়েছে অদম্য আগ্রহ। ওর এই ফলে আমরা গর্বিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত