আবরাহার হাতিবাহিনীর অলৌকিক ধ্বংস

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪১ এএম

৫৭০ খ্রিস্টাব্দে হাতিবাহিনী নিয়ে পবিত্র কাবা ধ্বংস করতে আসে ইয়েমেনের শাসক আবরাহা। শক্তি ও সামরিক প্রস্তুতিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী সেই বাহিনী শেষ পর্যন্ত ভয়ংকরভাবে ধ্বংস হয়। ঘটনাটি আরবের মানুষের কাছে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার স্পষ্ট নিদর্শন হয়ে ওঠে।

আবরাহার এই অভিযানের পেছনে ছিল কাবার প্রতি গভীর ঈর্ষা। সে দেখত, আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ প্রতি বছর হজ পালনের জন্য মক্কায় ছুটে আসে। ইয়েমেন থেকেও মানুষ কাবার উদ্দেশ্যে যেত। অথচ আবরাহা চেয়েছিল, মানুষ তার নির্মিত উপাসনালয়ের দিকে আকৃষ্ট হোক।

এই উদ্দেশ্যে সে ইয়েমেনে একটি বিশাল গির্জা নির্মাণ করে। এরপর আরবের মানুষকে সেখানে আসার আহ্বান জানায়। কিন্তু তার পরিকল্পনা সফল হয়নি। মানুষের হৃদয়ে কাবার প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধা ছিল, তা কমেনি। বরং হজের মৌসুমে আগের মতোই মানুষ মক্কার দিকে ছুটে যেতে থাকে।

একপর্যায়ে কিছু লোক আবরাহার নির্মিত গির্জাটিকে অসম্মান করে। এতে তার ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, কাবা ধ্বংস করে দিলে মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রও ধ্বংস হয়ে যাবে।

এরপর আবরাহা বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তার বাহিনীতে বিপুলসংখ্যক সৈন্য ছিল। সঙ্গে ছিল অনেক হাতি। আবরাহা নিজেও একটি শক্তিশালী হাতির পিঠে চড়ে অগ্রসর হচ্ছিল।

মক্কার কাছাকাছি পৌঁছে আবরাহার বাহিনী যখন মুহাসসার উপত্যকার দিকে আসে, তখন ঘটতে শুরু করে বিস্ময়কর ঘটনা। কাবার দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই আবরাহার প্রধান হাতিটি মাটিতে বসে পড়ে। তাকে যতই ওঠানোর চেষ্টা করা হোক, সে উঠছিল না। কিন্তু অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলে সে উঠে চলতে শুরু করত।

আবরাহা তবু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। সে হাতিটিকে কাবার দিকে নেওয়ার জন্য নানা চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু আল্লাহর ঘর ধ্বংস করার সেই পরিকল্পনা আর এগোয়নি।

মহান আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে পাঠালেন পাখির ঝাঁক। পবিত্র কোরআনে এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এসেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখোনি, তোমার রব হাতিওয়ালাদের সঙ্গে কী করেছিলেন? তিনি কি তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেননি? আর তিনি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠিয়েছিলেন। তারা তাদের ওপর পোড়ামাটির পাথর নিক্ষেপ করেছিল। অতঃপর তিনি তাদের ভক্ষিত তৃণের মতো করে দিলেন।’ (সুরা ফিল)

পাখিগুলো ছোট ছোট পাথর নিয়ে এসেছিল। কোরআনের ভাষায় সেগুলো ছিল ‘সিজ্জিল’ বা পোড়ামাটির পাথর। বাহিনীর ওপর এসব পাথর নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। আবরাহার সেনারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাদের সুসংগঠিত বাহিনী মুহূর্তেই বিপর্যস্ত হয়ে যায়।

মক্কার মানুষ তখন সরাসরি যুদ্ধের জন্য এগিয়ে যায়নি। কারণ আবরাহার বাহিনীর সঙ্গে মোকাবিলা করার মতো সামরিক শক্তি তাদের ছিল না। তারা মক্কার আশপাশের পাহাড় ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। আল্লাহর ঘরের নিরাপত্তার দায়িত্ব তারা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়।

এরপর আল্লাহর সাহায্যেই আক্রমণকারী বাহিনীর পতন ঘটে। সৈন্যরা প্রাণভয়ে পালাতে শুরু করে। অনেকে পাথরের আঘাতে মারা যায়। অনেকে আবার পালানোর সময় বিশৃঙ্খলায় পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায়। বিশাল বাহিনী অল্প সময়ের মধ্যেই ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। আবরাহাও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। সে ইয়েমেনের দিকে পালিয়ে যায়। কিন্তু তার শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে। প্রচণ্ড যন্ত্রণা সহ্য করে সে সানায় পৌঁছায়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

এই ঘটনার সংবাদ দ্রুত আরবের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ বিস্মিত হয়ে যায়। কাবার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আরও গভীর হয়। তারা উপলব্ধি করে, মানুষের শক্তি যত বড়ই হোক, আল্লাহর ক্ষমতার সামনে তা অতি ক্ষুদ্র।

এই ঘটনা মহান আল্লাহর ঘরের সুরক্ষা এবং তার অসীম ক্ষমতার এক অনন্য নিদর্শন। মহান আল্লাহ যখন কোনো বিষয় রক্ষা করতে চান, তখন মানুষের হিসাব সেখানে অচল হয়ে যায়।

সুরা ফিলের এই ঘটনা মুমিনদের জন্য একটি গভীর শিক্ষা। আল্লাহর শক্তির সামনে কেউ টেকে না। অন্যায় উদ্দেশ্যে যত বড় প্রস্তুতিই নেওয়া হোক, আল্লাহ চাইলে মুহূর্তেই তা ব্যর্থ করে দিতে পারেন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত