বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসকে নতুন উচ্চতায় নিতে আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ একটি অ্যাথলেটিকস সেন্টার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে রাজধানীর ডেমরার করিম জুট মিলকে বিবেচনা করছে ফেডারেশন। প্রায় ৫০.৬৯ একর জায়গাজুড়ে থাকা এই জুট মিলের সুবিশাল মাঠে আন্তর্জাতিক মানের ট্র্যাক স্থাপনের পাশাপাশি অ্যাথলেটদের আবাসন, জিমনেসিয়াম, ড্রেসিং রুম, চেঞ্জিং রুমসহ প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা গড়ে তুলতে চায় তারা।
সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শীতলক্ষ্যা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ডেমরার করিম জুট মিল ইতিমধ্যে পরিদর্শন করেছেন ফেডারেশনের কর্মকর্তারা। পুরো এলাকা ঘুরে দেখে মাঠের আয়তন, অবস্থান ও বিদ্যমান অবকাঠামো পর্যবেক্ষণ করেন তারা। প্রাথমিকভাবে ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের কাছে জায়গাটি অ্যাথলেটিকস সেন্টার তৈরির জন্য সম্ভাবনাময় বলেই মনে হয়েছে।
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) বর্তমান আওতাধীন ১৯৫৪ সালে ডেমরার শারুলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় করিম জুট মিলস। একসময় মিলজার হোসেন, নেলী জেসমিন, মোস্তাকুর রহমানদের মতো দেশসেরা অ্যাথলেটদের পদচারণায় মুখর ছিল এই মিলের মাঠ। ফুটবল অনুশীলনও হতো নিয়মিত। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ফুটবলের গোলপোস্টটি আজও সেই সাক্ষী দিচ্ছে। কিন্তু মাঠের ঘাস এখন পাঁচ ফুট উচ্চতায় ছেয়ে গেছে। ২০১৮ সালে ক্রীড়াঙ্গন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয় বিজেএমসি। ফলে আট বছর কোনো ক্রীড়াবিদের ছোঁয়া পায়নি মাঠটি। সেই মাঠটিকে ঘিরেই এখন নতুন স্বপ্ন বুনছে দেশের মাদার ডিসিপ্লিন অ্যাথলেটিকস। মাদার গেমস হলেও অ্যাথলেটিকসের নিজস্ব কোনো জায়গা নেই। নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন, আবাসন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই চলছে দেশের অ্যাথলেটিকস। তাই এখন করিম জুট মিলের এই জায়গাটির অবস্থানও ফেডারেশনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গুলিস্তান থেকে ডেমরার করিম জুট মিলের সড়ক দূরত্ব প্রায় ১৪ দশমিক ২ কিলোমিটার। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত গাড়িতে প্রায় ২০ মিনিটে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হলেও পাবলিক ট্রান্সপোর্টে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। রাজধানীর কেন্দ্র থেকে খুব বেশি দূরে না হওয়ায় জাতীয় দলের ক্যাম্প ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের জন্য জায়গাটি ব্যবহারযোগ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে করিম জুট মিলের আনুমানিক সড়ক দূরত্ব প্রায় ৩১ দশমিক ৯ কিলোমিটার। ফ্লাইওভার ও প্রধান সড়ক ব্যবহার করে গাড়িতে যেতে সাধারণত এক ঘণ্টা ২০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় লাগে। তবে যানজটের ওপর নির্ভর করে এই সময় কম-বেশি হতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজন বা বিদেশি অ্যাথলেটদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের কথা বিবেচনা করলেও যোগাযোগব্যবস্থাকে মোটামুটি সুবিধাজনক মনে করছে ফেডারেশন।
ফেডারেশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে একটি আধুনিক অ্যাথলেটিকস ট্র্যাক তৈরি করা হবে। পাশাপাশি ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের বিভিন্ন ইভেন্টের অনুশীলনের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান অ্যাথলেটদের দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্পে রেখে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সঙ্গে থাকবে আধুনিক জিমনেশিয়াম, ড্রেসিং রুম ও চেঞ্জিং রুম।
বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলী ইমাম তপন বলেন, ‘আমাদের নতুন সভাপতি আবদুল্লাহ আল জাবের অ্যাথলেটিকসে বড় আকারে সহযোগিতা করতে চেয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় করিম জুট মিল পরিদর্শন করেছি আমরা। এই জুট মিল সরকার আমাদেরকে দিলে আমরা একটি আন্তর্জাতিকমানের আধুনিক অ্যাথলেটিকস সেন্টার তৈরির চেষ্টা করব।’ তিনি যোগ করেন, ‘এখানে আন্তর্জাতিকমানের একটি অ্যাথলেটিকস সেন্টার তৈরী করতে পারলে, আন্তর্জাতিক আসরও নিয়মিত আয়োজন করতে পারব আমরা।’ ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুর মোরশেদ বলেন, ‘এমন একটি কেন্দ্র তৈরি করতে পারলে শুধু জাতীয় দলের অ্যাথলেটদেরই নয়, দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ অ্যাথলেটদেরও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতার জন্য অ্যাথলেটদের প্রন্তুত করা সহজ হবে।’
বর্তমানে বাংলাদেশে অ্যাথলেটদের নিয়মিত অনুশীলন, আবাসন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামোর যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটদের পাশাপাশি নতুন প্রতিভা তুলে আনার ক্ষেত্রেও এটি বড় বাধা। একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাথলেটিকস সেন্টার তৈরি হলে সেই সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে মনে করছে ফেডারেশন।
তবে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন সরকারের সহযোগিতা ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন। করিম জুট মিলের জায়গাটি ফেডারেশনকে বরাদ্দ বা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হলে পরবর্তী ধাপে বিস্তারিত পরিকল্পনা, নকশা ও অবকাঠামো নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। আর্থিক সংকট কাটাতে বিদেশি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংগঠনগুলোর সহায়তা নেওয়ারও চেষ্টা করবে ফেডারেশন।
ফুটবল-ক্রিকেটের পাশাপাশি অ্যাথলেটিকসেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা কম নয়। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ পেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও ভালো করার সামর্থ্য রয়েছে দেশের অ্যাথলেটদের। ডেমরার ৫০.৬৯ একর জায়গায় ফেডারেশনের এই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেলে বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকস পেতে পারে বহু প্রতীক্ষিত একটি আধুনিক প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নকেন্দ্র।