এক নামে চাকরি, আরেক নামে জমি!

বয়স কমানো থেকে শুরু করে ভিন্ন নামে জমি কেনা ও অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ—একজন সরকারি শিক্ষকের নথিপত্রে ১৭ বছরের গরমিল ও বহুমুখী অনিয়মের বিস্ফোরক তথ্য সামনে এসেছে!

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

জাতীয় পরিচয়পত্র ও চাকুরির নথিতে যার জন্মসাল ১৯৮০, পাসপোর্টে তা ১৯৬৩! একই ব্যক্তির দুটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্রে জন্মসালের ব্যবধান প্রায় ১৭ বছর। শুধু বয়সের জালিয়াতিই নয়, সরকারি চাকুরিতে ‘আনোয়ারা’ নামে থাকলেও জমির দলিলের মতো নথিতে তিনি ব্যবহার করেছেন ‘জাহানারা’ নাম। এমন একাধিক চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মাইরাগাঁও মন্নাফ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনোয়ারা আক্তারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।

বিভাগীয় মামলার নথি অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ধারা অনুযায়ী আনোয়ারা আক্তারের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগনামা জারি করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।

নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চাকুরির নথি ও জাতীয় পরিচয়পত্রে আনোয়ারা আক্তারের জন্মতারিখ ৮ মার্চ ১৯৮০। অথচ তাঁর পাসপোর্টে জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে ২ জানুয়ারি ১৯৬৩। আরও অদ্ভুত বিষয় হলো, নথিতে তাঁর বড় ছেলের জন্মসন ১৯৮৩! এসএসসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর (০৪৯০১৪/১৯৯৪/৯৫) অনুযায়ী, তিনি ১৯৯৮ সালে চৌদ্দগ্রামের বাকগ্রাম কাজী আহমদ আলী হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেন। পাসপোর্টের জন্মতারিখ অনুযায়ী তখন তাঁর বয়স দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ বছর, আর চাকুরির নথি মানলে বয়স হয় মাত্র ১৮ বছর। ফলে কোন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাঁর এসএসসি ও এনআইডির বয়স নির্ধারিত হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিভাগীয় মামলায় ওই শিক্ষকের সম্পত্তি ক্রয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি চাকুরিতে ‘আনোয়ারা আক্তার’ নামে থাকলেও ২০১৩ সালের দুটি দলিল (১৭০৭/১৩ ও ৯৭২১/১৩) এবং ২০১৯ সালের একটি দলিলে (৮৭৭০/১৯) নাম ব্যবহার করা হয়েছে ‘মোসা. জাহানারা আক্তার ভুলু’। সরকারি নাম গোপন রেখে ভিন্ন নামে জমি কেনার কারণ এবং আনোয়ারা ও জাহানারা একই ব্যক্তি কি না—তদন্তে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। এর বাইরে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ২০১৪ সালের ২৩ মার্চ পাসপোর্ট (নম্বর: বিএ-০৭০৩৯২৭) করা এবং ২০১৫ সালে ইতালি ভ্রমণের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

জালিয়াতির সত্যতা একপ্রকার স্বীকার করে নিয়েছেন অভিযুক্ত শিক্ষক আনোয়ারা আক্তার। তিনি জানান, তাঁর স্বামী ওই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন এবং তিনি মারা যাওয়ার পর গ্রামের সবাই মিলে তাঁর চাকুরির ব্যবস্থা করে দেন। তিনি আরও বলেন, চৌদ্দগ্রামের স্কুল থেকে ১৯৯৮ সালে বয়স ১৯ বছর বানিয়ে তাঁর ভাই তাঁকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেয়, যখন তাঁর আসল বয়স ছিল ৩০ বছর। চাকুরির সুবিধার জন্যই তিনি এনআইডি ও এসএসসিতে জন্মসাল ১৯৮০ করেছেন। তবে নামের ফারাক নিয়ে তাঁর দাবি, আনোয়ারা ও জাহানারা—দুটিই তাঁর নাম।

মাইরাগাঁও মন্নাফ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শারমিন আক্তার জানান, তদন্তের পরই বিষয়গুলো তাঁরা জানতে পেরেছেন। তবে এলাকায় তাঁকে সবাই ‘জাহানারা’ নামেই চেনে। বর্তমানে ওই শিক্ষকের বেতন চালু রয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে নাঙ্গলকোট উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল ওহাব বলেন, অভিযোগের পর তদন্ত প্রতিবেদন জেলায় পাঠানো হয়েছে, যার ভিত্তিতে বিভাগীয় মামলা ও শুনানি হয়েছে।

কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলী চৌধুরী জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত এবং এটি নতুন করে আবার তদন্ত করা হবে। সার্টিফিকেট সঠিক আছে কি না তা যাচাইয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক নুরুল ইসলাম জানান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীকালে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত