চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম জনবল সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে। ১টি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। তবে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা ১৭টি সরকারি দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে ৪৯০টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজ এবং কোনোরকম চলছে পরিষদের সার্বিক কার্যক্রম।
উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ১৭টি দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৬ জন কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। বাকি ১২টি কর্মকর্তার পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এই সংকট সামাল দিতে ৮টি পদে অন্য কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং ২টি পদে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে জোড়াতালিতে চালানো হচ্ছে প্রশাসনিক কাজ। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এই বিশাল ঘাটতির কারণে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সময়মতো মিলছে না কাক্সিক্ষত সেবা, যার ফলে সামগ্রিক উন্নয়নমূলক কর্মকা-ও ধীরগতির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদের যে ১২ কর্মকর্তার পদ শূন্য সেই পদগুলো হলো সহকারী কমিশনার (ভূমি), সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, আইসিটি কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, বন কর্মকর্তা ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা।
তবে, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা এখানে নিয়োগ থাকলেও জেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকার কারণে তিনি জেলাতেই বসেন। মতলব উত্তরে দাপ্তরিক কাজে উনি স্বাক্ষর করেন মাত্র।
এদিকে, ৮ কর্মকর্তা অন্য উপজেলায় নিয়োগ থাকলেও এ উপজেলায় অতিরিক্তের দায়িত্বের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কথা। কিন্তু এই কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দায়িত্বের মতলব উত্তর উপজেলায় কখনো সপ্তাহে ১দিন আসেন, আবার কোনো সপ্তাহে আসেন না। যাই আসেন, অনেকাংশে দায়িত্ব পালন শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে। অন্যদিকে, উপজেলায় ২ জন কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দীর্ঘদিন পদশূন্য রয়েছে, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, ১৫ জন প্রধান শিক্ষক, ১২০ জন সহকারী শিক্ষকসহ এ বিভাগের ১৭৫ পদ, প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, ৩ জন সহকারী শিক্ষা অফিসার, ১১৭ প্রধান শিক্ষক, ২৯ সহকারী শিক্ষকসহ এ বিভাগে শূন্য মোট ১৪৬ পদ, ৮ জন ডাক্তারসহ স্বাস্থ্য বিভাগের শূন্য পদ ৬১টি, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা এবং এ বিভাগের ২৩ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ এ বিভাগের ২৫ পদ, এসিল্যান্ডসহ ভূমি অফিসের ১১ জন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাসহ এ বিভাগের শূন্য পদ ২৪টি, উপজেলা প্রকৌশল (এলজিইডি) বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী, সার্ভেয়ার, হিসাবরক্ষকসহ এ বিভাগের ১১ পদ, সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ এ বিভাগের শূন্য পদ ৮টি, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাসহ এ বিভাগের ৬ পদ, সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ও ২ সহকারী মৎস্য কর্মকর্তাসহ এ বিভাগের ৫ পদ, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তাসহ এ বিভাগের ৫ পদ, খোদ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ২ পদে ডেপুটেশনসহ এ বিভাগে ৪ পদ, ভেটেরিনারি সার্জন, উপসহকারী প্রাণিসম্পদ অফিসারসহ প্রাণিসম্পদ বিভাগে শূন্যপদ ৪টি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাসহ এই বিভাগের ৩ পদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের শূন্য পদ ৩টি, খাদ্য বিভাগের শূন্য পদ ২টি, সমবায়, মহিলা বিষয়ক ও নির্বাচন বিভাগে পদ ১টি করে শূন্য এবং ৫টি ইউনিয়ন পরিষদে সচিবের পদও শূন্য রয়েছে।
উপজেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ বাহাউদ্দিনসহ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, শিক্ষা অফিসার, ৩ জন সহকারী শিক্ষা অফিসার ও ১১৭ জন প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম অনেকাংশেই ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার দপ্তরে সেবা নিতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এই ম্যাডামের কাছে যখনই কাজে আসি তখনই শুনি উনি চাঁদপুরে। এ বিষয়ে কথা হলে কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান জানান, এই উপজেলা পরিষদে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকায় উপজেলার নাগরিক সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম অনেকাংশে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ‘এত পদ শূন্যতার কারণে তো কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হবেই। তবে, এত শূন্যতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছি। এমপি মহোদয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে, আশা করি এই সমস্যার অচিরেই একটি সমাধান হবে।’