অভিমানে প্রায় তিন দশক আগে দেশ ছেড়েছিলেন সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার সোনাপুর গ্রামের মাসুক আহমদ (৫৫)। দীর্ঘ ৩০ বছর পর দেশে ফিরলেও স্বাভাবিকভাবে নয়-অসুস্থ ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায়। দেশে ফেরার মাত্র তিন দিনের মাথায় নিজ বাড়িতে মারা গেছেন তিনি।
মঙ্গলবার জকিগঞ্জের সোনাপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে মাসুক আহমদের মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর ভাতিজা ও দুবাইপ্রবাসী শাহেদুল আরেফিন।
জানা যায়, প্রায় ৩০ বছর আগে নিজের দোকানের সামনে কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তির সঙ্গে মাসুক আহমদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরিবারের অভিযোগ, ওই ঘটনার জেরে তাকে কুশিয়ারা নদীতে চুবিয়ে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি তার মনে গভীর আঘাত সৃষ্টি করে। অপমান ও লোকলজ্জার কারণে এরপর তিনি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পরিবারের দাবি, পরবর্তী সময়ে অবৈধ বা জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে চলে যান। সেখানে যাওয়ার পর আর বৈধ কাগজপত্রের আওতায় আসেননি। প্রায় ৩০ বছর ধরে অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে দেশটিতে বসবাস করেন তিনি।
পরিচিতরা জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার বিভিন্ন সময়ে অনিয়মিত অভিবাসীদের বৈধ হওয়ার সুযোগ দিয়ে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও মাসুক আহমদ সেই সুযোগ নেননি। দুবাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। প্রবাসে থাকাকালীন তার বাবা-মা ও এক ভাই মারা যান। লন্ডনপ্রবাসী স্বজনরাও বিভিন্ন সময়ে তাকে দেশে ফিরে আসার অনুরোধ করেছিলেন। তবে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
জানা যায়, প্রায় সাত মাস আগে মাসুক আহমদের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। এরপর তিনি কোমায় চলে যান। পরে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। দুবাইয়ের শেখ রাশিদ হাসপাতাল ও আজমানের থুম্বে হাসপাতালে কয়েক মাস তার চিকিৎসা চলে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘ চিকিৎসায় তার পেছনে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় হয়। তবে মানবিক বিবেচনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার তার চিকিৎসার পুরো ব্যয় মওকুফ করে দেয় বলে পরিবার জানিয়েছে।
শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গত শুক্রবার এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তাকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। সিলেটে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকেরা তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানান। পরে তাকে জকিগঞ্জের নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
দেশের মাটিতে ফেরার মাত্র তিন দিনের মাথায় নিজ বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মাসুক আহমদ। পরে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
দীর্ঘ ৩০ বছরের প্রবাসজীবন শেষে অসুস্থ ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় দেশে ফিরে মাত্র তিন দিনের মাথায় মৃত্যু-এভাবেই শেষ হলো মাসুক আহমদের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের করুণ অধ্যায়।