নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে হবে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫৭ এএম

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিতে যাচ্ছে সরকার। এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তা নিজেই কেন্দ্র নির্মাণ করবেন এবং বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ পাবেন। এই উদ্যোগে শিল্পোদ্যোক্তারা সরকারি ব্যবস্থাপনার চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশীদারত্ব থাকলেও বিদ্যুৎ বিক্রির প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সরকারের হাতে। কয়েকটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎ বিক্রি করেন। এর বাইরে সারা দেশের ভোক্তাদের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে সরকারি কোম্পানি।

বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের এই ধারণা দেশে নতুন নয়। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ ছিল জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য। তখন সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। কেউ বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে শেষ পর্যন্ত সফল হননি। তখন চট্টগ্রামের একটি বড় রি-রোলিং ও স্টিল মিলকে একটি ৪০০ মেগাওয়াটের কয়লাচালিত কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতিও দিয়েছিল সরকার। কিন্তু তারা কেন্দ্রটি আর নির্মাণ করেনি। অথচ তাদের নিজেদেরই প্রতিদিনের চাহিদা ছিল ২০০ মেগাওয়াটের বেশি।

উদ্যোক্তাদের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল, অনিশ্চিত ক্রেতার জন্য ব্যাংক কেন্দ্র নির্মাণে অর্থায়নে রাজি না হওয়ায় সেবারের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। তবে এখন নীতিমালা বদলে ব্যাংক ফাইন্যান্সের জন্য বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধারণাকে আকর্ষণীয় করা হচ্ছে। যদিও শিল্পোদ্যোক্তাদের গ্রিডের বিদ্যুতে আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন বলে এখনো মনে করা হয়। তবে এই সুযোগে বড় গ্রাহক নিজেই নিজের বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবেন।

বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কীভাবে চলবে : মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট বলতে এমন বিদ্যুৎকেন্দ্র বোঝানো হচ্ছে, যেখানে উদ্যোক্তা নিজ খরচে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবেন এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি নির্দিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে পারবেন। এর ফলে সরকারকে আগের মতো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে বিদ্যুৎ কিনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতায় যেতে হবে না। বরং বেসরকারি বিনিয়োগকারী উৎপাদন ও বিক্রির ঝুঁকি নেবেন। ক্রেতা শিল্পপ্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

ধরা যাক, একজন মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তা রাজশাহীর চরে একটি ১০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেন। তিনি সাভারে এই বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য ক্রেতা ঠিক করলেন। তাহলে মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তা উৎপাদিত বিদ্যুৎ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি পিজিসিবির গ্রিডে দেবেন। পিজিসিবির গ্রিড থেকে সাভার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।

এ ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি একটি সঞ্চালন চার্জ দিতে হবে পিজিসিবিকে। একই সঙ্গে গ্রাহকের আঙিনায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাভার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে বিতরণ চার্জ দিতে হবে। মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের উদ্যোক্তা যে দাম নির্ধারণ করবেন, তার সঙ্গে এই দুটি চার্জ যুক্ত হবে। এখন যে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়, সেখানেও একইভাবে এই দুই চার্জ যোগ করে হিসাব করা হয়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আগামী ২৩ আগস্ট এই চার্জ নির্ধারণের জন্য গণশুনানির আয়োজন করেছে।

উদ্যোক্তাদের লাভের জায়গা কোথায় : এখন গ্রাহকভেদে শিল্পকারখানার জন্য বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১২ টাকা ৭৩ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৮৫ পয়সা। সবশেষ গত ৩ জুন এই দাম নির্ধারণ করা হয়। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে এই দাম ফের বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, তাহলে একই দামে উদ্যোক্তা দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ পেতে পারেন। সরকারের তরফ থেকে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, এখন সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমে ৭ টাকার মধ্যে এসেছে।

উৎপাদন খরচের এই হিসাব ধরে পর্যালোচনা করলে, উদ্যোক্তার মুনাফা এবং সঞ্চালন-বিতরণ কোম্পানির চার্জ এক টাকা যোগ করা হলেও বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। সেক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে সাশ্রয় করতে পারবেন প্রায় তিন টাকার কাছাকাছি।

গ্রিডের বিদ্যুতে সরকার প্রতি বছর ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। কোনো কারণে এই ভর্তুকি সরিয়ে নিলে গ্রিডের বিদ্যুতের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একই দামে উদ্যোক্তা বিদ্যুৎ পাবেন।

সংকট কোথায় : দেশে সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া অন্য নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস সীমিত। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ সব সময় সরবরাহ করা সম্ভব নয়। আকাশে সূর্য থাকার সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কিত। এছাড়া হঠাৎ আকাশ মেঘলা হলে উৎপাদন কমে যেতে পারে। শীত মৌসুমেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হয়। আবার স্বাভাবিক দিনে সকালে এবং বিকেলে উৎপাদন কম হয়। সূর্য মধ্যগগনে থাকলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

এসব বিবেচনায় দেখা যায়, একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র সব সময় সমহারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তবে যদি বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ অন্য কেন্দ্রের বিদ্যুতের সঙ্গে সংমিশ্রণ করে বিতরণ করা হয়, তাহলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি মেলা সম্ভব।

অন্যদিকে শিল্পোদ্যোক্তারা সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের। কিন্তু সরকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে কোনো আশ্বাস এত দিনে দিতে পারেনি। এ কারণে গ্রিডের বিদ্যুতের বদলে বড় উদ্যোক্তারা গ্যাস নিয়ে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চাহিদা মিটিয়ে থাকেন। বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পেলেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে জানা গেছে।

সরকার কী সহায়তা করছে : বাণিজ্যিক কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে ২০ ভাগ কিনে নেবে পিডিবি। এছাড়া কোনো গ্রাহকের সঙ্গে চুক্তি করার পর ওই গ্রাহক ব্যবসা বন্ধ করে দিলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই বিদ্যুৎও পিডিবি কিনে নেবে, যাতে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রাহক লোকসান না করেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একেবারে অনিশ্চিত গ্রাহক থাকলে কোনো ব্যাংক কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ঋণ দিতে চাইবে না। এজন্য এই বিধান রাখা হচ্ছে। তবে কেন্দ্র নির্মাণ এবং অন্য সব কাজ উদ্যোক্তার নিজ দায়িত্বেই করতে হবে।

কী বলছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন : বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, কেন্দ্র নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ বিক্রি করবেন উদ্যোক্তা নিজেই। আমরা কেবল বিদ্যুতের সঞ্চালন এবং বিতরণের চার্জ নির্ধারণ করে দেব। এ ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকলেও সাশ্রয়ী হওয়ায় উদ্যোক্তারা আগ্রহী হবেন বলে মনে করেন তিনি।

জালাল আহমেদ বলেন, এখনো গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেওয়ার পর লোডশেডিংয়ের সময় গ্যাস বা তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চাহিদা মেটানো হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত